১৯৩৩ সালের ৩০শে জানুয়ারি৷
বার্লিনের ব্রান্ডেনবুর্গ তোরণ৷ বিশাল আয়োজন৷ নাৎসি প্রচারণাযন্ত্র প্রস্তুত৷ নাৎসি S.A. বাহিনীর প্রায় ২০,০০০ সদস্য মশাল জ্বালিয়ে কুচকাওয়াজ করছে৷ কয়েক ঘণ্টা আগেই অ্যাডলফ হিটলার তার লক্ষ্য পূরণ করেছে৷ প্রেসিডেন্ট পল ভন হিন্ডেনবার্গ তাকে জার্মান রাইখের চ্যান্সেলর হিসেবে নিযুক্ত করেছেন৷ হিটলারের অনুগামীরা তাই উৎসবে মেতে উঠেছিল৷ গোটা আয়োজনের পৌরোহিত্য করেছিল হিটলারের প্রচারণা যন্ত্রের প্রধান যোশেফ গোয়েবলস৷ হিটলারকে চ্যান্সেলারের প্রাসাদের জানালায় দাঁড় করিয়ে জার্মানির জন্য নতুন যুগের সূচনার কথা ঘোষণা করে সে৷ নাটকীয় সেই রাতকে ঘিরে যেন এক মায়াজাল রচনা করা হয়েছিল৷
কিন্তু, কিভাবে ক্ষমতায় এলেন হিটলার ও তাঁর নাৎসি দল??
১ম বিশ্বযুদ্ধে হিটলার একজন ডিসপ্যাচ রানার(বার্তা বাহক) হিসেবে জার্মান আর্মিতে যোগদান করেন। কিন্তু পরবর্তীতে, নিজ যোগ্যতাবলে তিনি কর্পোরাল পদে উন্নীত হন। যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে এসে হিটলার একবার মারাত্মক আহত হন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সুস্থ হওয়ার পরে, হিটলার সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে যাননি। বরং তিনি মিউনিখে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। মিউনিখে অবস্থানকালে তার বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়।
হিটলার তার আত্মজীবনীতে লেখেন,
"মিউনিখের পরিস্থিতি আমাকে স্তব্ধ করল। সারা শহর বিশ্বাসঘাতক জাতিতে(ইহুদী জাতি) ভরে গিয়েছে। অবশ্য এটা আমি আগেই অনুমান করেছিলাম। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি হবে, তা ভাবতে পারিনি। দেশের প্রতিটা মানুষ কাইজারের পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু ইহুদীরা যুদ্ধের বিপক্ষে। তাদের সম্প্রদায় থেকে তেমন কেউ যুদ্ধ করতে আসেনি। অন্যদিকে, কমিউনিস্ট শুয়োরগুলোও জার্মানিকে ছেড়ে সোভিয়েতদের সমর্থন করছে!!!!! নিজ দেশের প্রতি ভালবাসার ছিটেফোটাও নেই!!!!"
তিনি আরও লেখেন,
" অফিস আদালত, কল কারখানার, বড় বড় পদগুলো ইহুদীদের দখলে চলে গিয়েছে। তাদের হাতে দেশ চালনার দায়িত্ব দেওয়া যায়না। আমি দেখলাম, অফিসের প্রায় প্রতিটা ক্লার্কই একজন ইহুদী, আর প্রায় প্রতিটা ইহুদীই একেকজন ক্লার্ক" (Nearly every clerk was a jew and nearly every jew was a clerk)।"
মিউনিখে কয়েকদিন থাকার পর, হিটলার পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে চলে যান। কিন্তু মিউনিখে ইহুদীদের দৌরাত্ম্য তাকে গভীর দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়।
(ছবিঃ- প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিজের সঙ্গীদের সাথে হিটলার; একদম বাঁদিকে)
হিটলার ছিলেন এক অদ্ভুত চরিত্র। সাধারণ সৈনিকেরা তার আচার আচরণকে স্বাভাবিক মনে করত না। তিনি অন্যান্য সৈনিকের মত নারীবিষয়ক আড্ডায় যোগ দিতেন না। তিনি কখনো মদ স্পর্শ করতেন না। হিটলার সম্পর্কে তার এক সহযোদ্ধা মন্তব্য করেন,
"সে এক অদ্ভুত চরিত্র। ফ্রন্টে যুদ্ধ শেষে, সন্ধায় আমরা ট্রেঞ্চে ফিরে গিয়ে আড্ডা দিতাম। কিন্তু সে আমাদের সাথে আড্ডা দিতে আসতো না। অবশ্য আমাদের আড্ডার বিষয়বস্তুর সিংহভাগ ছিল নারী। এবং তিনি কখনো এই ব্যাপারে আলোচনা করতে উৎসাহবোধ করতেন না। দেশের জন্যে আমরাও তো যুদ্ধ করছি। কিন্তু তিনি সবচেয়ে আলাদা। আমাদের পরিবারের পিছুটান আছে। তার তাও নেই। বাস্তবিকই, আমরা বুঝতে পারি যে, দেশপ্রেমের সংজ্ঞা, তার ও আমদের ক্ষেত্রে ভিন্ন।"
১৯১৮ সালের ১০ নভেম্বর, জার্মানির আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে ১ম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। সেই সময় হিটলার আহত অবস্থায় পাসওয়াক হাসপাতালে পড়ে ছিলেন। খবরটি শুনে তিনি পাগলপ্রায় হয়ে যান। অনেক বছর পর বুক ফেটে কান্না আসে তার। বালিশে মুখ বুজে তিনি সেই কষ্ট চাপা দেন। সেই স্মৃতিচারণ করে হিটলার লিখেছিলেন,
“আমি যেন আবার অন্ধ হয়ে গেলাম। দিন আর রাতের মাঝে আর তফাৎ রইল না। এই অন্ধকার সময়ের ভেতরেই পরাজয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে আমার ভেতর নতুন করে জেগে উঠল ঘৃণা। হাসপাতালের নিঃসঙ্গ সময়েই আমি প্রতিজ্ঞা করলাম জার্মানিকে মুক্ত করতে, আবারো জার্মানিকে মহান করতে।”
তিনি তার আত্মজীবনীতে বলেছেন,
"সবকিছু তাহলে বৃথা গেল, বৃথা গেল সব কষ্ট, সব আত্মত্যাগ, বৃথা গেল ভয়ঙ্কর সব দিনগুলোর কষ্ট, যখন আমরা জীবন বাজি রেখে দেশের জন্যে যুদ্ধ করছিলাম। বৃথা গেল ২০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ। তবে কি তারা এসবের জন্যে জীবন দিয়েছেন? কতগুলো বেজন্মা পাপীর দল, প্রিয় পিতৃভূমিকে নিঃস্ব করবে, আর এই কারনেই কি ২০ লাখ জার্মান শহীদ হল?"
১ম বিশ্বযুদ্ধের জন্যে সম্পুর্নরূপে জার্মানিকে দায়ী করা হয়। পুরো যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে তাদের বাধ্য করা হয়। হাজার বছরের জার্মান জাতির গৌরব ধূলিসাৎ করতে, তাদের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিতে, আর কোনোদিন যেন ক্ষমতার লড়াইে নামতে না পারে এই লক্ষ্যে জার্মানদের অন্যায় ভার্সাই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। হিটলার লেখেন,
"আমি বুঝতে পারছি, সবকিছু শেষ হয়ে গিয়েছে। একমাত্র বোকা, মিথ্যুক আর বিশ্বাসঘাতকেরাই শত্রুর কাছ থেকে ভাল মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার আশা করতে পারে। প্রতিটা রাত আমি নানাবিধ ভাবনায় পার করে দিই। যতই ভাবি ততই তাদের প্রতি আমার ঘৃণাবোধ বাড়তে থাকে। অথচ আমরা কি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারতাম না? দেশকে যারা ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্যে বেঁচে দিয়েছে তাদের ক্ষমা নেই। তারা বেজন্মা পাপী। কঠোর শাস্তিই তাদের প্রাপ্য।"
হিটলার আরও বলেন,
"এসব ভাবতে গেলেই আমার চোখ জ্বালা করতে শুরু করে।(১ম বিশ্বযুদ্ধে হিটলার শত্রুর গ্যাস আক্রমণের শিকার হন। বেশ কয়েকদিন ধরে তাকে চোখ জ্বালা কষ্ট সহ্য করতে হয়)। কিন্তু এই জ্বালা আমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণকে বন্ধ করতে পারেনি।"
আর তারপর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন-
"আমি আমার নিয়তি নির্ধারণ করে ফেলেছি। আমি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি রাজনীতি শুরু করব।"
১৯১৮ সালে, জার্মানির অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সঙ্গিন। দেশের বিভিন্ন শহরে অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। মিউনিখ শহরও এর ব্যতিক্রম নয়। নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করা হলেও, স্থানে স্থানে, বিভিন্ন সংগঠন বিপ্লব ঘটাচ্ছিল। এসব তথাকথিত বিপ্লবে, অংশগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাদের মধ্যে, অধিকাংশ হল যুদ্ধফেরত সৈনিক। দীর্ঘ চারটা বছর যুদ্ধ করার পর, তারা এসে দেখে যে, তাদের ন্যায্য অধিকারটুকু তারা পাচ্ছে না। আর এই কারনেই, ততকালীন সরকারের বিরুদ্ধে অনেকেই বিপ্লবে অংশ নিচ্ছিলেন।
দেশে তখন ব্যাঙের ছাতার মত রাজনৈতিক দল গজিয়ে উঠছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল আবার বামপন্থী মানসিকতার। এমনই এক অস্থির সময়ে মিউনিখে অবস্থান করছিলেন হিটলার। তার কোন বন্ধু বান্ধব, চেনা জানা, কেউ ছিলনা। এরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে থেকে যে রাজনীতি করা যাবে না, তাও তিনি খুব ভাল করে টের পাচ্ছিলেন। কিন্তু তার কোন উপায় ছিল না। মিউনিখের এই বেকার ও হতাশাগ্রস্ত জীবন নিয়ে তিনি লিখেন,
"প্রতিটা দিন আমি শুধু চিন্তা করে কাটিয়ে দিতাম। কিন্তু কোন কুল কিনারা পেতাম না। কি করব, কিভাবে শুরু করব, কার সাথে যোগাযোগ করব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।প্রতিবার আমি চিন্তা করতে বসি, আর প্রতিবারই আমি উপলদ্ধি করি যে আমি কতটা অসহায়। আমি আমার দেশের জন্যে কিছুই করতে পারছি না।"
এভাবে হতাশাপূর্ণ দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল তার। ইতিমধ্যে, পেটের দায়ে, তিনি সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত একটি যুদ্ধবন্দি ক্যাম্পে, প্রহরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শুরু করেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণের কারণে, এই চাকরি পেতে তার সুবিধাই হয়েছে এক প্রকার।
হিটলারের রাজনৈতিক জীবনে, প্রথম অগ্রগতি আসে, এই সেনাবাহিনীর হাত ধরেই। সেনাবাহিনীতে তখন রাজনৈতিক বিষয়ে বিভিন্ন শিক্ষামূলক ক্লাস হত। যুদ্ধবন্দি শিবিরের প্রহরী হওয়া সত্ত্বেও হিটলার সেসব ক্লাসে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন খুবই মনোযোগী। এর সুফলও তিনি হাতে নাতে পেয়ে যান। বেশ কয়েকদিন পর, তাকে একটি আর্মি রেজিমেন্টে, অনুরূপ রাজনৈতিক বিষয়াবলী নিয়ে ক্লাস নেওয়ার জন্যে, এডুকেশনাল অফিসার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। সন্দেহাতীতভাবে, এটি ছিল তার রাজনৈতিক জীবনে এক বড় ধরণের অগ্রগতি। এ যেন একেবারে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া। এডুকেশনাল অফিসার হিসেবে, যেমন, রাজনৈতিক বিভিন্ন কূটচাল সম্পর্কে জানা সহজ হল, ঠিক তেমনি, বক্তৃতা দেওয়ার পুরোনো ক্ষমতাটিকে আবার একটু ঝালাইও করে নেওয়া গেল। হিটলার ভেবেছিলেন, যুদ্ধে গ্যাস আক্রমনের কারণে তার বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এডুকেশনাল অফিসার হিসেবে তিনি তার বাগ্মিতা পরখ করে দেখতে পারলেন। তিনি খেয়াল করলেন বক্তৃতা দেওয়ার সময়, তার রেজিমেন্টের সৈনিকেরা একেবারে মন্ত্রমুগ্ধের মত তার কথাগুলো শোনে। তখনো কেও জানত না, আর কয়েক দশক পর, সম্মোহনী দৃষ্টির অধিকারী, বাগ্মি এই লোকের কথাতেই উঠবে বসবে পুরা জাতি।
১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরের কোন এক সকালে, এডুকেশনাল অফিসার অ্যাডলফ হিটলারের কাছে আর্মির পলিটিকাল ব্রাঞ্চ থেকে একটি চিঠি আসে। চিঠির মাধ্যমে তিনি জানতে পারলেন যে, তিনি একটি ছোট খাট রাজনৈতিক দলকে, পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পেয়েছেন। এর নাম "জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি"(German Workers' party- Deutsche Arbeiterpartei)। সংক্ষেপে একে ড্যাপ (DAP) বলা হত। হিটলার অতি উৎসাহের সাথে এই কাজে নেমে পড়লেন। তিনি তখনো জানতেন না, এই দলটিকে নিয়েই তিনি ইতিহাসের অংশ হতে যাচ্ছেন। কয়েকদিন অতি উৎসাহ নিয়ে তিনি পার্টির সভা পর্যবেক্ষণে গেলেন। কিন্তু পড়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। চিঠিতে বলা হয়েছিল যে, এই পার্টির মূলনীতি একটু ব্যতিক্রমী। কিন্তু তিনি দেখতে পেলেন, যাহা বাহান্ন, তাহাই তিপ্পান্ন।
তিনি লেখেন,
"এটি তেমন আহামরি কিছু নয়। উল্লেখযোগ্য কিছুই এখানে হচ্ছে না।"
তাঁর মতে,
"আজকাল এক নতুন হুজুগ জেগেছে মানুষের। আজকাল কেউ উন্নয়নের ব্যাপারে একটু অসন্তুষ্ট হলেই, কয়েকজন মিলে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে ফেলছে। এই পার্টির কথাই ধরা যাক। বিয়ার হলে ২০-২৫ জন মানুষ রাজনৈতিক তর্ক বিতর্ক করছেন, কিন্তু কোন সমাধানে পৌঁছুতে পারছেন না। এদের থেকে আর কিই বা আশা করা যায়?"
একদিনের ঘটনা। হিটলার ধৈর্যের চরম পরীক্ষায় হেরে গিয়ে, পার্টির সভা ত্যাগ করে বেরিয়ে আসছিলেন। সভায় তখন বক্তৃতা দিচ্ছিলেন এক বৃদ্ধ প্রফেসর। তিনি তার বক্তৃতায়, এক অতি বিতর্কিত এবং প্রায় দেশদ্রোহীমূলক কথার অবতারনা করেন। তার কথায় ভারসাই চুক্তির প্রতি সমর্থনের ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছিল। হিটলার তা স্পষ্ট শুনতে পান। তৎক্ষণাৎ তিনি ভিতরে ঢুকে যান এবং মঞ্চে উঠে এর প্রতিবাদ করেন। হিটলার এমন তীব্র ভাষায় বৃদ্ধকে আক্রমণ করেন যে, বৃদ্ধ তার কথাগুলো ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন এবং হিটলারের কথা শেষ হবার আগেই সভাস্থল ত্যাগ করেন। নিজের বক্তৃতা শেষ হবার পর, অতি উত্তেজিত হিটলার যা বলে উঠেন, বাংলায় সারমর্ম করলে তা দাঁড়ায়,
"যাক, প্রফেসরকে ধুয়ে দিলাম।"
পুরো সভাস্থলে এতক্ষন পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছিল। কিছুক্ষণ পর পার্টির সদস্যদের মধ্যে থেকে একজন রোগা ব্যক্তি উঠে এসে হিটলারকে বললেন,
"আমি অ্যান্টন ড্রেক্সলার(Anton Drexler), এই পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। আমি চাই আপনি আমাদের পার্টিতে জয়েন করুন। আমরা এক মহান ব্রত নিয়ে নেমেছি এবং এই সংগ্রামের পথে আপনার মত লোকের খুব প্রয়োজন। আশা করি আপনার সাথে খুব শীঘ্রই দেখা হবে অ্যাডলফ হিটলার।"
এই বলে তিনি হিটলারের হাতে পার্টির একটি ম্যানিফেস্টো ধরিয়ে দিলেন।
(ছবিঃ- অ্যান্টন ড্রেক্সলার)
জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টিতে হিটলারের যোগদানের ঘটনাটি, অত্যন্ত আকস্মিকভাবে ঘটে যায়। প্রস্তাব পাওয়ার পরে তিনি ভাবনায় পড়ে যান। সারারাত তিনি ঘুমোতে পারেননি। তিনি নিজে একটি রাজনৈতিক দল গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টিতে যোগদান করলে সেই আশা পূরণ হবে না। তার উপর, রাজনৈতিক দলটি একেবারে আনাড়ি। সেখানে যোগ দিলে, সবকিছু একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু বড় সুবিধাটি হচ্ছে, নতুন গঠিত এই রাজনৈতিক দলে, তিনি অনায়াসে একটি বড় পদ পেয়ে যেতে পারেন। এছাড়া, মিউনিখে তার কোন পরিচিত লোক নেই। পরিচিতির অভাবে তিনি রাজনৈতিক জীবন শুরুই করতে পারছিলেন না। জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টিতে যোগদান করলে, অন্তত এক প্রকার ভিত্তি তো পাওয়া যাবে।
এসব ভাবতে ভাবতে তিনি রাত পার করে দেন। সকালে তার নামে একটি চিঠি আসে। তিনি অবাক হয়ে দেখেন যে, চিঠিটি পাঠিয়েছেন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্টন ড্রেক্সলার। ওই দিন বিকালে, পার্টির একটি বৈঠক আছে। হিটলার যদি আনুষ্ঠানিকভাবে পার্টিতে যোগদান করতে চান, তবে তাকে অবশ্যই উক্ত সভায় উপস্থিত থাকতে হবে।
উত্তেজনায় সারা দুপুর হিটলার কিছু খেতে পারেননি। পার্টিতে যোগ দেওয়াটা কি ঠিক হবে?অবশেষে, নিয়তিই তাকে পার্টির উদ্দেশ্যে রওনা দিতে বাধ্য করে। সেদিনের সেই বৈঠকে, তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন করানো হয়।
(ছবিঃ- DAP-র সদস্য হিসাবে হিটলারের পরিচয়পত্র)
বৈঠকে পার্টির অন্যান্য সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন গটফ্রিড ফেদার(Gottfried Feder), আর্ন্স্ট রোম(Ernst Röhm), দিত্রিচ এখার্ট(Dietrich Eckart) প্রমুখ।
গটফ্রিড ফেদার ছিলেন একজন বিত্তবান ব্যক্তি। সমাজের প্রভাবশালীদের সাথে তার যোগাযোগ ছিল। অপর দিকে ডাইট্রিচ এখার্ট ছিলেন একাধারে একজন কবি, লেখক এবং সাংবাদিক। মদের প্রতি তার তীব্র আকর্ষণ ছিল। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন আর্ন্স্ট রোম। আর্ন্স্ট রোম ছিলেন ১ম বিশ্বযুদ্ধ ফেরত একজন পোড় খাওয়া সৈনিক। যুদ্ধের পর, তিনি ক্যাপ্টেন হিসেবে মিউনিখের আর্মি ডিসট্রিক্টে কর্মরত ছিলেন। এই লোকগুলোকে নিয়েই, হিটলার তার কিছুটা পথ পাড়ি দিবেন।
(ছবিঃ- বাঁদিক থেকে- গটফ্রিড ফেদার, আর্ন্স্ট রোম ও দিত্রিচ এখার্ট)
হিটলার পার্টিতে যোগদানের পর, পার্টির ভাগ্য রাতারাতি খুলে যায়। হিটলারের বাগ্মিতা চুম্বকের মত মানুষ টানতে থাকে। তবে অগ্রগতি ছিল সামান্যই। ১৯২০ সালে হিটলার পার্টির প্রোপাগ্যান্ডার দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েকদিন পর, হিটলার একটি উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ নেন। তিনি একটি বিশাল জনসভার পরিকল্পনা করেন। এতদিন পার্টির কার্যক্রম চলত নিতান্তই ছোট পরিসরে। আর বিশাল জনসভার আয়োজন করার কথা তো ছোট রাজনৈতিক দলগুলো ভাবতেই পারত না। হিটলার চেয়েছিলেন সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে। তিনি এক্ষেত্রে সফলও হন। হিটলার নিজ হাতে আমন্ত্রণপত্রের খসড়া তৈরি করেন। স্বভাবতই সেখানে কঠোর ও আবেগী ভাষার সংমিশ্রণ ছিল। সেই জনসভায় ২০০০ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এটি এক বিরাট সাফল্য। সভা ২ ঘন্টা স্থায়ী হয়। তার মাঝে হিটলার নিজেই এক ঘন্টা বক্তৃতা দেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই সভা ছিল পার্টির জন্যে একটি বিরাট অগ্রগতি।
১৯২০ সালে হিটলার পার্টিতে কিছু পরিবর্তন আনেন। তিনি পার্টির নাম পরিবর্তন করে ন্যাশনাল সোশালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি, সংক্ষেপে NSDAP, রাখার মত প্রকাশ করেন। ন্যাশনাল সোশালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টির জার্মান নাম হল, Nationalsozialistische Deutsche Arbeiterpartei। হিটলার আরও বলেন যে, পার্টির সংক্ষিপ্ত নাম হবে নাৎসি(Nazi)। National এর 'NA' আর Sozialistische এর 'ZI' থেকে 'NAZI' নামটি এসেছে। নামটা শুনলেই যেন মানুষের মনে শিহরণ জাগে, হিটলার এমনটা চেয়েছিলেন।
এখানেই শেষ নয়। নাম পরিবর্তনের পর হিটলার পার্টির অবিসংবাদিত নেতা হওয়ার দাবি তুলেন। তিনি দাবি করেন যে, তাকে নেতা বানানো হলে এবং সকলের সহায়তা পেলে, তিনি জার্মানির হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করে ছাড়বেন। নেতার পদ না দেওয়া হলে তিনি পদত্যাগ করার হুমকি দেন। পার্টির নেতা বনে যাওয়ার পর হিটলার বসে থাকেননি। সমগ্র দেশ জুড়ে সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর জন্যে তিনি ব্যপক প্রচার শুরু করেন। এরই মাঝে নাৎসি পার্টির সিকিউরিটি শাখা গঠিত হয়। এর নাম দেওয়া হয়, Sturmabteilung (Storm Detachment)। সংক্ষেপে একে S.A. বলা হত।
(ছবিঃ- ন্যুরেমবার্গে S.A. বাহিনির প্যারেড, ১৯২৯)
S.A. এর কাজ ছিল নাৎসি নেতাদের নিরাপত্তা প্রদান করা, বিভিন্ন রাজনৈতিক সভায়, নাৎসিদের নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকা। তবে S.A কে মাঝে মাঝে বিশেষ কাজে পাঠানো হত। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের উত্থান ঠেকানো, তাদের সভা পন্ড করে দেওয়া, লোকজনকে অনান্য রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে নিরুৎসাহিত করা, এই বিশেষ কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯২০ সালের গ্রীষ্মে, হিটলার তার সৃজনশীলতার চরম প্রকাশ ঘটান। "প্রচারেই প্রসার", এই নীতি বাক্য তিনি তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই বিশ্বাস করতেন। আর ১৯২০ সালে এসে, তিনি এক মারাত্মক পরিকল্পনা করেন।
(ছবিঃ- নাৎজি পার্টির প্রতীক)
হিটলার খেয়াল করে দেখলেন যে, পার্টির নির্দিষ্ট কোন প্রতীক নেই, কোন পতাকা নেই। অথচ একটি প্রতীক যে কত বেশী গুরুত্বপূর্ণ তা তিনি ঠিকই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। হিটলারের মতে, জনগণকে আকৃষ্ট করার জন্যে, একটি প্রতীক অতি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। প্রতীকটিতে অবশ্যই দলের মূলনীতির প্রতিফলন ঘটাতে হবে। আর, প্রতীকটি হতে হবে এমন, যেন মিত্ররা তা দেখা মাত্রই উত্তেজিত হয়ে উঠে এবং আবেগের জোয়ারে ভেসে যায়। আর শত্রুরা যেন ভয়ে লেজ তুলে পালায়।
(ছবিঃ- নাৎজি পার্টির পতাকা)
এসব শর্ত পুরণ করে হিটলার নিজেই একটি পতাকা তৈরি করে ফেলেন। প্রস্তাবিতও অন্যান্য পতাকার মধ্যে তার পতাকাই শ্রেষ্ঠ ছিল। পতাকাটিতে ছিল লাল পটভূমিতে একটি সাদা বৃত্ত। বৃত্তের উপর একটি কালো বাকানো স্বস্তিকা। পতাকার লাল অংশ, নাৎসি পার্টির সংগ্রামের সামাজিক বিস্তৃতির দিকটি ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ, একজন খাটি জার্মান, তার সামজিক অবস্থা যাই হোক না কেন, তিনি নাৎসিদের সংগ্রামের অংশ হতে পারবেন। সাদা অংশ পার্টির জাতীয়তাবাদী আদর্শকে তুলে ধরে। আর কালো স্বস্তিকা, সমগ্র বিশ্বের সকল জাতির উপর আর্য জাতির শ্রেষ্ঠত্বকে তুলে ধরে। নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, হিটলার তার এই কাজে পুরোপুরি সফল ছিলেন। কেননা, আর উনিশটা বছর পর, হিটলারের নেতৃত্বে, এই পতাকাতলে দাড়িয়ে, পুরো জার্মান জাতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল।
১৯২৩ সাল।
এতদিনে নাৎসি পার্টি একটি সুগঠিত রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। সদস্যসংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। এছাড়া অর্থনৈতিকভাবেও তেমন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। এটি মুলত সম্ভব হয়েছে, পার্টির নেতা অ্যাডলফ হিটলারের বাগ্মিতার কারণে। তার বক্তৃতা শুনতে অনেকেই আসেন, এবং তারা যথাসাধ্য আর্থিক সহায়তা দিয়ে যান। এছাড়া, হিটলারের জীবনেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। ১৯১৯ সালের সেই একাকী জীবনকে তিনি পিছনে ফেলে এসেছেন। এখন তার অনেক বন্ধু, অনেক সহচর। নাৎসি পার্টিতেও অনেক করিৎকর্মা ব্যক্তি যোগ দিয়েছেন। যেমন হেরমান গোয়েরিং(Hermann Göring) ও রুডলফ হেস(Rudolf Hess)। হিটলার তাদেরকে অন্ধের মত বিশ্বাস করেন।
(ছবিঃ- বাঁদিক থেকে- হেস, হিটলার আর গোয়েরিং, ১৯৩৪ সালের ১লা মে, বার্লিন বিমানবন্দর)
১৯২৩ সালের এই সংকটময় মুহুর্তে, হিটলার কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভেবে দেখলেন যে, জার্মানিতে গণতন্ত্র অচ্ছুত হয়ে পড়েছে। ক্ষমতা দখল করার এখনই সময়। পার্শ্ববর্তী দেশ ইতালিতে, মুসোলিনি, ফ্যাসিস্ট সরকার কায়েম করেছে। মুসোলিনি তার বাহিনী নিয়ে, রাজধানীতে কুচকাওয়াজ করে প্রবেশ করেন এবং অস্ত্রের মুখে ক্ষমতা দখল করেন। হিটলারেরও ইচ্ছে হল, এই পদ্ধতিতে ক্ষমতা দখল করার।
কিন্তু জার্মানি এবং ইতালি সম্পুর্ন ভিন্ন দুটি দেশ। মুসোলিনি যা অনায়াসে করতে পেরেছিলেন, হিটলার তা নাও করতে পারেন। হিটলারের তা জানা ছিল। অনেক চিন্তাভাবনা করে তিনি এক মহা পরিকল্পনা করেন।
১৯২৩ সাল, ৯ নভেম্বরের রাত্রি।
বার্গারব্রকলার(Bürgerbräukeller) নামক বীয়ার হলে, ৩ হাজার মানুষের এক বিশাল সভার আয়োজন করা হয়েছে। সভায় উপস্থিত থাকবেন, বাভারিয়ার ডেপুটি কমিশনার, গুস্তাভ রিটার ভন কাহ্র(Gustav Ritter von Kahr), কর্নেল সাইসার(Hans Ritter von Seisser), জেনারেল লসো(Otto von Lossow)।
রাত ৯টার মধ্যে, সমগ্র বীয়ার হল লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। লোকজন, বিয়ারের গ্লাস হাতে নিয়ে, কেউ দাড়িয়ে, কেউবা বসে, অতিথিদের বক্তৃতা শুনবেন। মানুষ ভেবেছিল, এটা অন্য যে কোনদিনের সভার মত একটি সাধারণ সভা হতে যাচ্ছে। কিন্তু তারা জানত না তাদের জন্যে কি অপেক্ষা করছে। সভা আরম্ভ হবার আধ ঘন্টা পড়ে, বীয়ার হলে হঠাৎ করে একদল খাকি পোশাক পরিহিত অস্ত্রধারী সৈন্যদল প্রবেশ করে। তারা সব দরজা জানালা বন্ধ করে দেয়, এবং এমনভাবে অবস্থান নেয়, যাতে কেউ পালাতে না পারে। জনগণ বুঝতে পারে, এরা নাৎসি পার্টির সিকিউরিটি শাখা S.A. এর লোকজন। লোকজন আরও অবাক হয়ে লক্ষ্য করে, বীয়ার হলের দ্বিতীয় তলায়, কয়েকজন S.A. মেশিন গান নিয়ে অবস্থান নিয়েছে। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে গেল। লোকজন দেখতে পেল, সেই অদ্ভুত গোঁফওয়ালা লোক, যিনি আবার ওই দলের প্রধান, রিভলভার হাতে প্রবেশ করছেন। লোকজন তার নাম জানে। তার আগমনে চারিদিকে শোরগোল পড়ে গেল।
(ছবিঃ- অভ্যুত্থানের সময় মিউনিখের রাস্তায় S.A. বাহিনি)
হিটলার হট্টগোল থামাতে একটি ফাঁকা গুলি ছুড়লেন। হট্টগোল থেমে গেলে, তিনি বলে উঠলেন,
"সব খেল খতম। জাতীয় বিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছে। আপনারা ধৈর্য ধরুন। কেউ চলে যাবেন না। রাইখ সরকারকে সড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সমস্ত আর্মি ব্যারাক এবং পুলিশ ফাঁড়ি আমাদের দখলে। আজ সমগ্র সেনাবাহিনী এবং পুলিশ, এক নাৎসি স্বস্তিকার নিচে সমবেত হয়েছে।"
হিটলারের শেষ দুটি বাক্য ছিল ডাহা মিথ্যা। কিন্তু কারো পক্ষে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব ছিল না। ফলে সবাই তা সত্য হিসেবেই ধরে নেয়। এছাড়া হিটলারের এই কথা শুনে মানুষ উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তারা গণতান্ত্রিক Weimar Republic সরকারবিরোধী শ্লোগান দিতে থাকে। হিটলার মনে মনে খুশী হন, কারণ সবকিছু পরিকল্পনামাফিক হচ্ছে। এরপর হিটলার, ডেপুটি কমিশনার কাহ্র(Gustav Ritter von Kahr), কর্নেল সাইসার(Hans Ritter von Seisser), জেনারেল লসো(Otto von Lossow)কে, অস্ত্রের মুখে জোড় করে পাশের একটি রুমে নিয়ে যান।
সেখানে হিটলার তাদের বলেন যে, গণতন্ত্র শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন তার দল কুচকাওয়াজ করে ক্ষমতা দখল করবে। আর্মি এবং পুলিশ তার দখলে(মিথ্যা কথা)। তিনি এই তিনজনকে, তার দলে যোগ দেওয়ার আদেশ দেন। বিনিময়ে, নতুন সরকার গঠনের পর, তাদেরকে উচু পদ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
(ছবিঃ- শিল্পীর কল্পনায় বীয়ার হল অভ্যুত্থান চলাকালীন বক্তৃতারত হিটলার)
অতঃপর, হিটলার তাদেরকে চিন্তা করার সময় দিয়ে বের হয়ে আসেন এবং লোকজনকে তার দলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন। তিনি চিৎকার করে বলে উঠেন,
"ভিতরের রুমে ডেপুটি কমিশনার কাহ্র, কর্নেল সাইসার, জেনারেল লসো আছেন। তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। আপনারা তাদের সাহায্য করুন। হে লোকসকল, বলুন, আপনারা আমার পাশে আছেন কিনা??"
তখন চারদিক থেকে বিকট শব্দে ধ্বনিত হয়, "আছি আছি।" হিটলার তখন বিজয়ীর বেশে বলে উঠেন,
"আমাদের কোন আত্মস্বার্থ নেই। শুধু আছে একটাই রক্ত শপথ, তা হল, দুর্জোগের এই ঘনঘটায় প্রিয় পিতৃভূমির জন্যে কিছু একটা করা। "শুনুন, হে লোকসকল। হয় আজকে আমাদের বিজয় হবে, নতূবা কাল সকালের মধ্যেই আমরা মারা পড়ব।"
কিন্তু অন্যদিকে, অবস্থা প্রতিনিয়ত খারাপ হচ্ছিল। ওই তিন জন ব্যক্তি সহজে দমবার পাত্র নন। হিটলার কোনোভাবেই তাদের রাজি করাতে পারছিলেন না। শেষ চেষ্টা হিসেবে, তিনি তার রিভলভার বের করেন, এবং বলেন উঠেন, "এই রিভলভারে চারটা গুলি আছে, ৩টা আপনাদের জন্যে, আর একটা আমার নিজের জন্যে। আজকেই সব কিছুর নিষ্পত্তি হবে। হয় আপনারা আমার কথায় রাজি হবেন নয়ত মৃত্যুর জন্যে তৈরি থাকুন।" হিটলারের এই কথাই কাজ হল। কিছুক্ষণ ইতস্তত করার পর, তিনজনই তার প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলেন। মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে জয়ী হয়ে, হিটলার রুম থেকে বেরিয়ে আসেন। তখনো জনগণ শ্লোগান দিয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু বাইরে এসে তিনি এক অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদ পান। তিনি জানতে পারলেন যে অন্য আরেকটি স্থানে, তার S.A. বাহিনীর একটি গ্রুপের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। নেতা হিসেবে তার দায়িত্বই হল, এই সংকট নিরসন করা। আর এই চরম মূহুর্তে এই সংকট নিরসন করা একান্ত জরুরি। কেননা, হিটলার পুলিশের চক্ষুশূল হতে চাননি। এই কারণে, তিনি ডেপুটি কমিশনার কাহ্র, কর্নেল সাইসার, জেনারেল লসো কে বীয়ার হলে রেখে ছুট লাগালেন।
কিন্তু এটা ছিল একটা মস্ত বড় ভুল। অনভিজ্ঞ হিটলার তখন তা বুঝতে পারেননি। কেননা, হিটলার চলে যাওয়ার সাথে সাথে ওই তিন জন বেঁকে বসেন। তারা ছল চাতুরি করে বীয়ার হল থেকে বের হয়ে এসে পালিয়ে যান। হিটলার যখন বীয়ার হলে ফেরত আসেন, তিনি বুঝতে পারেন, কত বড় ভুলটাই না তিনি করেছেন। পরদিন, বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়, রেডিওতে এবং বিভিন্ন নোটিশবোর্ডে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়-
"কয়েকজন উগ্রমানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তির ছলচাতুরি এবং বিশ্বাসঘাতকতার কারণে, বার্গার-ব্রকলার(Bürgerbräukeller) বীয়ার হলের সভা পুরোপুরি পন্ড হয়েছে। বন্দুকের নলের মুখে, কর্নেল সাইসার(Hans Ritter von Seisser), জেনারেল লসো(Otto von Lossow) এবং আমার কাছ থেকে, তারা যে সব দাবি-দাওয়া আদায় করে নিয়েছে, আমি আমার নিজ ক্ষমতাবলে তা বাতিল ঘোষণা করছি। সেই সাথে, রাষ্ট্রদ্রোহ এবং অন্যান্য বিশৃঙ্খলামূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত থাকবার দায়ে, আজ থেকে, "ন্যাশনাল সোশিয়ালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স্ পার্টি"(National Socialist German Workers Party) সংক্ষেপে নাৎসি পার্টিকে, সম্পুর্ণরূপে অবৈধ ঘোষণা করা হল।"
কিন্তু, ঘটনা এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। অনেকে নাৎসি পার্টির শেষ দেখে ফেললেও, হিটলারের কাছে প্ল্যান B ছিল। হিটলারের অনুরোধে, এবার দৃশ্যপটে হাজির হন জেনারেল এরিক লুডেনডর্ফ(Erich Ludendorff)। জেনারেল লুডেনডর্ফ ছিলেন ১ম বিশ্বযুদ্ধের একজন জার্মান নায়ক। আর্মির কাছে লুডেনডর্ফ নামটি টনিকের মত কাজ করবে, হিটলার তা জানতেন। লুডেনডর্ফকে দেখলে, আর্মি হিটলারের পাসে এসে দাঁড়াবে, এই আশায়, হিটলার লুডেনডর্ফকে নিজ দলে ভিড়িয়েছিলেন।
(ছবিঃ- টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে জেনারেল লুডেনডর্ফ; ১৯ নভেম্বর, ১৯২৩)
প্ল্যান B-র পরিকল্পনা অনুসারে, হিটলার এবং জেনারেল লুডেনডর্ফ, নাৎসি পার্টির একটি বিশাল দল নিয়ে বাভারিয়ান ডিফেন্স মিনিস্ট্রি বিল্ডিং এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথে বিভিন্ন স্থানে তাদের চেকপোস্ট পার হতে হয়। কিন্তু নাৎসি পার্টির বিভিন্ন সদস্যের সাথে চেকপোস্টের সেন্ট্রিদের, কোনো না কোনো সূত্রে পরিচয় ছিল। এই কারণে, মিছিলটি সহজে চেকপোস্টগুলো পার হয়ে যায়। কিন্তু এরপরেই বিপত্তি বাঁধে। ঠিক যখন দলটি ওডিওন্স্প্লাত্জ্(Odeonsplatz) নামক একটি স্থানে এসে পৌছায়, তখন ১০০ অস্ত্রধারী পুলিশের একটি দল তাদের পথরোধ করে এবং চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। হিটলার পুলিশের ক্যাপ্টেনের কাছে গিয়ে বলেন, "দেখুন আমাদের বিপ্লবে বাঁধা দিবেন না। মহান লুডেনডর্ফ আমাদের সাথে আছেন।"
পুলিশের ক্যাপ্টেন তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে বলে উঠেন, "লুডেনডর্ফ কে? তাকে তো আমরা চিনি না।"
এই বলে সবগুলো পুলিশ, নাৎসিদের দিকে অস্ত্র তাক করে ধরে। হিটলার তখন বুঝতে পারলেন যে, লুডেনডর্ফের মাধ্যমে আর্মিকে টলানো গেলেও, পুলিশকে টলানো যাবে না। কিন্তু তিনি সাহস হারালেন না। তিনি তার দলকেও অস্ত্র তাক করার আদেশ দিয়ে বসেন। এরপর যে ঘটনাটি ঘটে, তা ইতিহাসে 'ব্লাড-ফ্ল্যাগ' নামে পরিচিত। পুলিশ বাহিনী এবং নাৎসি বাহিনী উভয়েই একে অপরকে গুলি করার হুমকি ধামকি দিয়ে শাসাতে থাকে। অনেকক্ষণ ধরে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ ও শাসানোর কাজ চলতে থাকে। কিন্তু কেউই আগে গুলি করার সাহস পাচ্ছিল না। হিটলার সামনে অনড় হয়ে দাড়িয়ে থাকেন।
(ছবিঃ- অভ্যুত্থানের দিন ওডিওন্স্প্লাত্জ্, ৯ নভেম্বর, ১৯২৩)
হঠাৎ করে, কোন এক অজ্ঞাত স্থান থেকে গুলির শব্দ পাওয়া যায়। ব্যাস, আর যাবে কোথায়!! গুলির শব্দ শুনা মাত্র, উভয় পক্ষ, পাগলের মত গুলি ছুড়তে থাকে। গোলাগুলিতে নাৎসি পার্টির ১৬ জন মেম্বার নিহত হন। ৩জন পুলিশ নিহত হয়। উচ্চ পর্যায়ের নাৎসিদের মধ্যে, গোয়েরিং মারাত্মক আহত হন। আর হিটলার? ১ম গুলির শব্দ শুনার সাথে সাথেই তিনি মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তার কাঁধের একটি হাড় স্থানচ্যুত হয়। তিনি যদি ঝাপিয়ে না পড়তেন, তাহলে নির্ঘাত মারা যেতেন।
১৯২৩ সালে সংঘটিত, বীয়ার হলের এই বিদ্রোহ সম্পুর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। দিত্রিচ এখার্ট, যিনি নিজ হাতে গড়া দলের নির্মম পরাজয় অবলোকন করলেন, বিপ্লবের ছয় সপ্তাহ পর অতিরিক্ত মদ্যপানে তিনি মৃত্যুশয্যায়। দেহত্যাগ করার আগে তিনি বলেছিলেন,
“তোমরা হিটলারকে অনুরসণ কর। সে সুরের তালে নৃত্য করবে, যে সুর আমিই তৈরি করেছিলাম। আমার জন্য শোক করোনা। জার্মানির ইতিহাসে আমার থেকে বেশি প্রভাব আর কারো থাকবে না।”

(ছবিঃ- বিচারকার্যের সময় অভিযুক্ত আসামিরা; বাঁ দিক থেকে- হাইনজ পার্নে, ফ্রিডরিচ ওয়েবার, উইলহেম ফ্রিক, হেরমান ক্রিবেল, জেনারেল লুডেনডর্ফ, হিটলার, উইলহেম ব্রুকনার, আর্নস্ট রোম এবং রবার্ট ওয়াগনার , ১১ নভেম্বর, ১৯২৩)
পরবর্তিতে নাৎসি পার্টির কয়েকজন নেতার বিচার হয় এবং তাদেরকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান করা হয়। হিটলারের কারাদণ্ডের সময়সীমা ছিল ৫ বছর। কিন্তু পরবর্তিতে বিশেষ বিবেচনায় তা কমিয়ে করা হয়, আট মাস।
১৯২৪ সাল।
(ছবিঃ- ল্যান্ডসবার্গ কারাগারে হিটলার; সাথে এমিল মরিস, হেরমান ক্রিবেল, হেস এবং ফ্রিডরিচ ওয়েবার, ১৯২৩ সাল)
রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অ্যাডলফ হিটলার ল্যান্ডস্বার্গ কারাগারে আট মাসের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। কারাগারে তিনি বিশেষ বন্দীর মর্যাদা পেয়েছেন। একটি বড় আরামদায়ক কক্ষে তাকে রাখা হয়েছে এবং “বিশেষ বন্দীর” যাবতীয় সুযোগ সবিধা তাকে প্রদান করা হয়েছে। এরকম পরিবেশে বসে, হিটলার তার ছায়াসঙ্গী রুডলফ হেসকে ক্রমাগত একটি বইয়ের ডিকটেশন দিয়ে যাচ্ছিলেন। বইটি হিটলারের রাজনৈতিক ভাবাদর্শের নিদর্শন। এর মাধ্যমে, মানবজাতি জানতে পারবে, নাৎসিবাদ তথা ন্যাশনাল সোশালিজম কি জিনিস। জানতে পারবে তার স্বপ্নের কথা, তার আদর্শের কথা। জানতে পারবে তার সংগ্রামের যৌক্তিকতার কথা। বইটির কাজ দ্রুত শেষ করা অত্যন্ত জরুরি। পাণ্ডুলিপি তৈরি হওয়ার পর, হিটলার বইটির নাম দেন “Viereinhalb Jahre (des Kampfes) gegen Lüge, Dummheit und Feigheit” বাংলায় যার অর্থ, “মিথ্যাচার, নেমকহারামি এবং কাপুরুষতার বিরুদ্ধে আমার সাড়ে চার বছরের সংগ্রাম।“
ফলে যা হওয়ার তাই হল। বইটির প্রকাশক ম্যাক্স আমান(Max amann), কোনরূপেই এই বিদঘুটে নাম মেনে নিতে চাইলেন না। ম্যাক্স আমান ছিলেন নাৎসিদের পাবলিশিং সংস্থার প্রধান। তিনি হিটলারকে বললেন যে, এরকম বিদঘুটে নাম দেখলে, লোকজন লাথি দিয়ে বইটি ফেলে দিবে। তার জোরাজুরিতে বইটির নাম রাখা হয় Mein Kamph বা “আমার সংগ্রাম”।
বইটি নিয়ে আমানের এত বেশী উচ্চাশা ছিল না। তিনি আশা করেছিলেন হিটলার বীয়ার হল বিদ্রোহ নিয়ে মেলা কিছু লিখবেন। সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি পাঠকদের আগ্রহকে ধরে রাখতে সাহায্য করবে, আমান এমনটাই বিশ্বাস করতেন। বইটিকে আত্মজীবনী বলার চেয়ে রাজনৈতিক ভাবাদর্শ প্রচারের একটি মাধ্যম বলা যেতে পারে। নাৎসিবাদ যদি হয় একটি ধর্ম, তাহলে Mein Kamph হবে নাৎসিদের বাইবেল।
(ছবিঃ- 'মাইন কাম্ফ'-এর প্রথম সংস্করণ ১৯২৬-২৭)
বইটির দ্বিতীয় অংশে, জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে হিটলার পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা খরচ করেছেন। নিজস্ব যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, অন্য সব জাতি নিকৃষ্ট। জার্মান জাতি, হিটলারের মতে যারা আর্যদের প্রতিনিধিত্ব করে, তারাই হবে পৃথিবীর রাজা।
বইয়ের প্রথম সংকরণ ১৯২৫ সালে প্রকাশিত হয়। প্রথম বছর বিক্রি হয় ৯,০০০ কপি। কিন্তু পরবর্তী তিন বছরে এ সংখ্যা কমতে থাকে। ১৯৩০ সালে, নির্বাচনে নাৎসি পার্টির দ্বিতীয় স্থান লাভ করার সুবাদে বইয়ের বিক্রি বেড়ে ৫৪,০০০ কপিতে গিয়ে দাড়ায়। আর ১৯৩৩ সালে, হিটলারের চ্যান্সেলর হওয়ার বছরে, বইয়ের বিক্রি অকল্পনীয় ১০ লাখ কপিতে গিয়ে ঠেকে। এর পড়ে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। পড়ুক বা না পড়ুক, মানুষ এই নাৎসি বাইবেলটিকে নিজেদের ঘরে রেখে কিছুটা নিরাপদবোধ করতেন।
১৯২৫ সালে হিটলার কারগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। তিনি বুঝতে পারলেন, সংগ্রামের পথ এখন আরো বন্ধুর। নাৎসি পার্টিকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তার বক্তৃতা দেওয়ার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি ১৯২৭ সাল পর্যন্ত বক্তৃতা দিতে পারবেন না। এমতাবস্থায়, অনেকেই হিটলারের শেষ দেখে ফেলেছিলেন। কারণ, মানুষ জানতেন, সবাক হিটলার যা করতে পারবে, নির্বাক হিটলার তার কিছুই করতে পারবে না।

(ছবিঃ-ডক্টর ইয়ালমার হোরেস গ্রিলি শাখট)
চারদিকে এমনিতেই করুন অবস্থা ছিল, তার উপর মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে আরেকটা সমস্যার সৃষ্টি হয়। ১৯২৫ সালে, জার্মানি তার অর্থনৈতিক দুরাবস্থা কাটিয়ে উঠবার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠে। ডক্টর ইয়ালমার হোরেস গ্রিলি শাখট(Hjalmar Horace Greeley Schacht) নেতৃত্বে, জার্মানি তার অর্থনৈতিক মন্দাভাব কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছিল। যেখানেই গনতন্ত্রের অস্তিত্ব রয়েছে, সেখানেই আমেরিকা তার হাত প্রসারিত করেছে। আমেরিকা জার্মানিকে প্রত্যক্ষভাবে আর্থিক সাহায্য দান করতে থাকে। জার্মানিকে সেই সময়ে প্রদান করা অনেক ঋণ, আমেরিকা কোনদিন ফেরতও চায়নি। আর তাছাড়া “ডস প্ল্যান”(The Dawes plan) নামক একটি বিশেষ প্ল্যানের কল্যাণে, জার্মানিকে ১ম বিশ্বযুদ্ধের যে অকল্পনীয় বাৎসরিক ক্ষতিপূরণ দিতে হত, তাও মোটামুটি প্রদানযোগ্য পরিমাণে নেমে আসে।
এছাড়া আমেরিকার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ফ্রান্স, জার্মানির বানিজ্যিক অঞ্চল, তথা রুঢ়(Ruhr) অঞ্চল থেকে নিজেদের অনেকাংশে গুটিয়ে নেয়। ফ্রান্সের কাছ থেকে নিজেদের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অঞ্চল তথা রুঢ় অঞ্চল ফিরে পেয়ে জার্মানি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
ধীরে ধীরে জার্মানরা তাদের স্বাভাবিক স্বচ্ছন্দ জীবন ফিরে পেতে শুরু করে। মানুষ ভুলে যেতে শুরু করে ভার্সাই চুক্তির কথা। আর এটাই ছিল হিটলারের দুশ্চিন্তার বড় কারণ। যে সরকার ব্যবস্থায় মানুষ সুখী স্বচ্ছন্দ জীবনের নিশ্চয়তা পাচ্ছে, তাকে মানুষ সহজে ত্যাগ করবে না। সুখী মানুষ সহজে পরিবর্তন চায় না। হিটলার বলেন,
“একজন ত্রাণকর্তার আবির্ভাব ঘটবে ঘোড় বিপদের সময়ে। আমাদের এখন অপেক্ষা করতে হবে মোক্ষম সময় ও সুযোগের জন্যে। আমরা এখন কেবল আশা করতে পারি যে, এই সুসময় বেশীদিন থাকবে না।”
হিটলারের কথা বাস্তবে পরিণত হবে চারটি বছর পর। অবশ্য, এই দীর্ঘ অপেক্ষার সময়গুলো হিটলার বসে বসে কাটিয়ে দেননি। অনেকে তার শেষ দেখে ফেলেছিলেন। কিন্তু তারা জানতেন না যে, হিটলার ছিলেন একজন চমৎকার সংগঠক। উপরের মহলে লাগাতার তদবির করবার মাধ্যমে, নাৎসি পার্টি পুনরায় তাদের বৈধতা ফিরে পায়। অবশ্য, হিটলারের বক্তৃতার উপর নিষেধাজ্ঞা তখনো বহাল ছিল। হিটলার এবার নাৎসি বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করেন। রাষ্ট্রের আদলে, নাৎসি পার্টিকে গড়ে তুলবার যুগান্তকারী পরিকল্পনা করা হয়। হিটলার বলেন,
“যেহেতু বর্তমান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার স্থলাভিষিক্ত হব, সেহেতু পার্টির সকলেরই রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম নীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি সম্পর্কে বাস্তব ধারনা থাকা উচিত। মানুষ এখনও বুঝতে পারছেনা, তাদের এই সুখ সাময়িক। আমরা এখনও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারিনি। আমরা ক্ষমতায় এলে, বর্তমান পরিকল্পনাটি, আমাদেরকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছুতে সহায়তা করবে।"
হিটলারের এই পরিকল্পনা অনুসারে, নাৎসি বাহিনী হবে- A State Within a State. "রাষ্ট্রের অন্তঃপুরে আরেক রাষ্ট্র"। এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে, নাৎসি পার্টিকে ঢালাও করে সাজানো হয়। রাষ্ট্র ব্যবস্থার আদলে সৃষ্টি করা হয়, কৃষি বিভাগ, বিচার বিভাগ, স্বরাষ্ট্র বিভাগ, অর্থনৈতিক বিভাগ, শ্রম বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ, সেই সাথে জাতি ও সংস্কৃতি বিভাগ। এছাড়া খোলা হয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং সবশেষে, নাৎসিদের বিখ্যাত প্রোপ্যাগান্ডা বিভাগ।দলে দলে যেন মানুষ নাৎসি পার্টিতে যোগদান করে, সেই লক্ষ্যে খোলা হয় কিছু বিশেষ বিভাগ। যেমন, Hitlerjugend বা Hitler Youth, এটি ছিল ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের জন্যে। ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের জন্যে আলাদা সংঘঠন ছিল। কিশোরদের পরিপূর্ন বিকাশ সাধনা এবং তাদের নাৎসি মূলমন্ত্রে দীক্ষিত করাই ছিল Hitler Youth-এর কাজ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে, সিংহভাগ Hitler Youth গ্র্যাজুয়েটদের নিয়ে গঠন করা হয়, দুধর্ষ 12th SS Panzer Division "Hitlerjugend"। মিত্রবাহিনী স্বীকার করেছিল যে, Hitlerjugend- এর সদস্যরা ছিল মারাত্মক বেপরোয়া। সহজে তারা আত্মসমর্পন করত না।
(ছবিঃ- Hitlerjugend-এর সদস্যদের সাথে করমর্দনরত হিটলার, ১৯৩৯ সাল)
এছাড়া নারী সদস্যের জন্যে নাৎসি পার্টিতে ছিল আলাদা অঙ্গসংগঠন। সংগঠন ছিল ডাক্তারদের জন্যে, উকিলদের জন্যে, বিচারকদের জন্যে। এমনকি সিনেমা নির্মাতা, চিত্রশিল্পী, কবি সাহিত্যিকদের জন্যেও সংগঠন ছিল। হিটলারের এই সিউডো-রাষ্ট্রে, আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়, S.A. কে। আর রাজনৈতিক কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার জন্যে খোলা হয় নতুন শাখা কুখ্যাত Schutzstaffel বা SS, বাংলায় যার অর্থ "নিরাপত্তা বাহিনী"। S.S এর নেতা ছিলেন একজন কৃষিবিদ্যায় ডিগ্রীধারী কৃষক-কাম-রাজনীতিবিদ, নাম হাইনরিখ হিমলার (Heinreich Himmler)। শুরুতে S.S এর সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র ২০০ । কিন্তু ১৯৪৫ সালের মধ্যে তা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। ততদিনে কসাই হিমলারের নেতৃত্বে, এই সংগঠনটি পৃথিবীর ইতিহাসে কিছু জঘন্যতম অপরাধ সংঘটিত করে ফেলেছিল।
(ছবিঃ- হাইনরিখ হিমলার ও তাঁর SS-বাহিনী)
রাষ্ট্রের আদলে পার্টিকে সাজানো হয় এবং সেই সাথে খোলা হয় অনেক বিভাগ। সমগ্র দেশজুড়ে নাৎসি পার্টির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা হিসেবে, জার্মানিকে ভাগ করা হয় ৯৮টি "গাউ (Gau)" এ। গাউ শব্দের বাংলা অর্থ হল "অঞ্চল"। এছাড়া অষ্ট্রিয়াতে, নাৎসি পার্টির অষ্ট্রিয়া শাখার আওতাধীন, অতিরিক্ত ৭টি গাউ সৃষ্টি করা হয়। প্রতিটি গাউ এর দায়িত্ব দেওয়া হয় একজন "গাউলেইতার"(Gaulieter বা Gauleader)কে। এদের কাজ হল, পার্টির পক্ষে সর্বাত্মক প্রচালনা চালানো, নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা, সদস্যদের মধ্যে সংহতি রক্ষা করা, সর্বপরি নিজেদের আদর্শে অটল থাকা এবং সেই আদর্শ যথাসম্ভব প্রকাশ করা।
এভাবে হিটলারের মহা পরিকল্পনা অনুযায়ী নাৎসি পার্টি গড়ে উঠতে থাকে। ফলে, ১৯২৯ সাল নাগাদ, সদস্য সংখ্যা গিয়ে দাড়ায় ১,৩০,০০০ এ। পার্টিতে হিটলার হয়ে উঠেছিলেন অবিসংবাদিত নেতা। তার প্রভাব এত বেশী বেড়ে যায় যে, ১৯২৯ সাল নাগাদ, পার্টিতে তার নামে স্লোগান চালু হয়। ইতালির মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দলের স্যালুটের আদলে প্রবর্তন করা হয় "নাৎসি স্যালুট"। ডান হাত আশীর্বাদের ভঙ্গিতে একটু উঁচু করে সোজাসুজি ধরে স্যালুট দেওয়া হত। সেই সাথে সম্বোধন করতে চাইলে বলা হত, "হাইল হিটলার(heil Hitler)"।
ক্ষমতালাভের দিকে প্রথম পদক্ষেপ
১৯৩০ সাল।
অর্থনৈতিক ধসের কারণে বিপদে পড়েছে অনেক রাষ্ট্র। বিশ্ব অর্থনীতিতে এরকম খারাপ অবস্থা আগে কখনো হয়নি। বিপর্যয়ের মূলকেন্দ্র আমেরিকার ত্রাহি অবস্থা। আর জার্মানি? আমেরিকার সাহায্যে বেড়ে উঠা দেশটি, ১৯৩০ সালে পুনরায় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। বৈশ্বিক মন্দার কোপানলে পড়ে লোকজন সর্বস্বান্ত। অধিকাংশ মানুষের হাতে কোনো কাজ নেই। মুদ্রাস্ফীতি পুনরায় দেখা দিতে শুরু করেছে এবং জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে হু হু করে। চারিদিকে দুর্বিষহ অবস্থা। সেই ১৯২৩ সালের ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক মন্দা আর মুদ্রাস্ফীতির যেন পুনরাগমন ঘটে।
এরকম একটা সময়েরই অপেক্ষায় ছিলেন হিটলার। তিনি বুঝলেন, এবার খেল দেখানোর সময় এসেছে। তার প্রবল বিশ্বাস, ভাগ্যদেবী তার সাথে আছেন। এবার আর কোনো ভুলের অবকাশ নেই। ১৯৩০ সালের বৈশ্বিক মন্দার জের ধরে জার্মানিতে পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দেওয়া হয় এবং তৎকালীন চ্যান্সেলর হাইনরিখ ব্রুনিং (Heinrich Brüning) এর আদেশে পুনরায় জাতীয় নির্বাচন জারি করা হয়। নির্বাচনে নাৎসি পার্টিও অংশগ্রহণ করে। ১৯২৮ সালের নির্বাচনে, নাৎসি পার্টি পেয়েছিল ৮,১০,০০০ ভোট। পার্লামেন্টে সীট পেয়েছিল ১২টি। ১৯৩০ সালের এই নির্বাচনে নাৎসিরা কমবেশি ৫০টি সিট পাবে, হিটলার এমনটাই আশা করেছিলেন।
কিন্তু হিটলার বড্ড ভুল ভেবেছিলেন। নির্বাচনে নাৎসি পার্টির ফলাফল দেখে তিনি নিজেও অবাক হয়ে যান। সব হিসাব নিকাশ পাল্টে দিয়ে নির্বাচনে নাৎসিরা দ্বিতীয় হয়। ভোট পায় ৬৪,০৯,০০০টি। পার্লামেন্টে সিট ১০৭টি। নির্বাচনের পড়ে দেখা গেল, নাৎসিরা জার্মানির দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। এরপর নাৎসিদের আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ভাগ্যদেবী দুহাত ভরে তাদের দিকে থাকে।
১৯৩১ সাল।
প্রেমিকা গেলি রাউবালের (Geli Raubal) অকস্মাৎ আত্মহত্যার কারণে, হিটলার দারুন মুষড়ে পড়েছিলেন। গেলির মৃত্যুর প্রভাব পড়েছিল হিটলার কাজের উপর। এর ফলে, প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ(Paul Von HIndenberg) এবং চ্যান্সেলর হেইনরিখ ব্রুনিং এর সাথে দুটো অতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা পর্ব একেবারে যাচ্ছেতাই হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গের সাথে এটাই ছিল হিটলারের প্রথম সাক্ষাতকার। এটি ছিল নাৎসিদের সাথে সরকারের উচ্চ মহলের প্রথম অতি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ। অথচ হিটলারের উদাসীনতার কারণে এটি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। প্রেসিডেন্টের সামনে হিটলার ছিলেন মাত্রাতিরিক্ত বিমর্ষ এবং উদাস। স্থান, কাল, পাত্র সম্পর্কে যেন কোন ধারণাই তার নেই।
হিটলার বেরিয়ে যাওয়ার পর, প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল কার্ট ভন স্লাইশার(Kurt Von Schleicher) কে বলেন, "এই ছোকড়া হতে চায় প্রেসিডেন্ট? তার তো ডাক বিভাগের প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণের যোগ্যতা নেই।" তিনি হিটলারকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। দুই বছর পড়ে, হিটলার তাকে তার নিজের কথা হজম করতে বাধ্য করে ছাড়েন।
(ছবিঃ- চ্যান্সেলর ব্রুনিং, প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্লাইশার)
এই পর্যায়ে এসে কার্ট ভন স্লাইশার সম্পর্কে কিছু বলে নেওয়া একান্ত জরুরি। ১৯৩১ সালে তিনি ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল, সেই সাথে এক মারাত্মক প্রভাবশালী চরিত্র। তারই সুপারিশে, প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ, জেনারেল উইলহেম গ্রোনারকে(Wilhelm Groener) মিনিস্টার অফ ডিফেন্স পদে নিযুক্ত করেন। এমনকি ১৯৩০ সালে, ব্রুনিংকে জার্মান চ্যান্সেলর বানানোর পিছনে তার হাত ছিল বলে শোনা যায়। এই লোক মারাত্মক ধূর্ত। তার নামের অর্থ জানলেই তা বোঝা যায়। উল্লেখ্য, স্লাইশার শব্দের অর্থ হল, "গোপনে অনুপ্রবেশকারী"।
১৯৩৩ সালে হিটলার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। হিটলার চ্যান্সেলর হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের আগে, স্লাইশার অল্প মেয়াদে জার্মানির চ্যান্সেলর পদে নিযুক্ত ছিলেন। হিটলারকে তিনি কখনই বুঝতে পারেননি। উল্টে তাকে সমর্থন দিয়ে গিয়েছিলেন। এটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। পরবর্তীতে নিজের ভুল বুঝতে পেরে, গনতন্ত্রকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টাটুকু করেন। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছিল। হিটলার কখনো তাকে বিশ্বাস করতেন না। কার্য হাসিলের জন্যে তার সাথে মেলামেশা করতেন। পরবর্তীতে ১৯৩৪ সালে হিটলার কর্তৃক পরিচালিত Operation Hummingbird এ, অন্যান্য অনেক S.A নেতাদের সাথে তাকেও হত্যা করা হয়।
হিটলারের দ্বিতীয় বৈঠকটি ছিল চ্যান্সেলর হেইনরিখ ব্রুনিং সাথে। বৈঠকের এক পর্যায়ে হেইনরিখ ব্রুনিং তাকে একটি জটিল প্রস্তাব দেন।
১৯৩১ সালে, প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গের বয়স ছিল ৮৫ বছর। ১৯৩২ সালে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার ৭ বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে আসছিল। বয়স তাকে অনেকাংশে কাবু করে ফেলেছিল। ফলে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার ইচ্ছাটুকু তার ছিল না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিলে, দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে, হিটলারের পাল্লায় নিশ্চিতভাবে বেশী ভোট পড়বে। উগ্র জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হিটলার প্রেসিডেন্ট হয়ে যাবেন, এটা চ্যান্সেলর হেইনরিখ ব্রুনিং কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। কিন্তু এদিকে পরিস্থিতি মারাত্মক ঘোলাটে। নতুন মেয়াদে পুনরায় ৭ বছর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করাটা, হিন্ডেনবার্গের পক্ষে খুব কঠিন হয়ে যাবে। তার জীবনপ্রদীপ নিভে আসছে। অন্যদিকে হিটলারের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এখন হিন্ডেনবার্গ যদি ২-৩ বছর দায়িত্ব পালন করে মারা যান(এই সম্ভাবনা হেইনরিখ ব্রুনিং কোনভাবেই নাকচ করতে পারছিলেন না), তবে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে এবং নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে নাৎসিরা সেই নির্বাচন জিতে যাবে। এই কারণে হেইনরিখ ব্রুনিং হিটলারকে থামাতে নতুন পরিকল্পনা করেন।
ব্রুনিং হিন্ডেনবার্গকে নির্বাচনে দাঁড়াতে অনুরোধ করেন। হিন্ডেনবার্গ নির্বাচনে দাঁড়ালে হিটলার জিততে পারবে না। ব্রুনিং হিন্ডেনবার্গকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর, একটি নতুন ডিক্রী জারি করতে বলেন। হিন্ডেনবার্গ যদি ৭ বছর পূরন করতে না পারেন, তবে এই ডিক্রীর ক্ষমতাবলে, তিনি পুরাতন জার্মান রাজপরিবার থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে পারবেন। ব্রুনিংএর এই কথা শুনে হিন্ডেনবার্গ মারাত্মক রেগে যান। ব্রুনিংকে ভীতু, কাপুরুষ বলে গালিগালাজ করেন তিনি। তিনি বলেন যে তিনি কোনদিন এমন কাজ করতে পারবেন না। যদি রাজতন্ত্র থেকে কেউ ক্ষমতায় আসে তবে তিনি হবেন স্বয়ং কাইজার দ্বিতীয় উইলহেম(১ম বিশ্বযুদ্ধকালীন জার্মান রাজা। যুদ্ধের পর তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়) ছাড়া আর কেউ নয়। ব্রুনিংকে তিনি বলেন যে, তিনি এসব ডিক্রী জারি করতে পারবেন না। এসব ডিক্রী জারি করার বাধ্যবোধকতা যদি না থাকে, তবেই তিনি নির্বাচনে দাঁড়াবেন।
এখন হিটলারের সাথে প্রথম বৈঠকে, ব্রুনিং, হিটলারকে প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গের নির্বাচনে দাঁড়ানোর ব্যাপারে অপারগতার কথা জানান। ব্রুনিং হিটলারকে অনুরোধ করেন, যেন তিনি হিন্ডেনবার্গকে নির্বাচনে দাঁড়াতে রাজি করানোর ক্ষেত্রে ব্রুনিংকে সাহায্য করেন। ব্রুনিং প্রথমে হিটলারকে গোপন ডিক্রীর কথা কিছুই বলেননি। কিন্তু হিটলারের চাপে ব্রুনিং তাকে গোপন ডিক্রীর কথা বলতে বাধ্য হন। ডিক্রীর কথা শুনার সাথে সাথে হিটলার বুঝে যান, ডিক্রীটি তাকে শেষ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখবেন, এই বলে হিটলার বৈঠক থেকে বেরিয়ে চলে আসেন। অনেক ভেবে চিন্তে, হিটলার চালাকি করে, ব্রুনিংএর সাথে আর একটিবারও দেখা না করে সরাসরি হিন্ডেনবার্গের সাথে দেখা করেন। প্রেসিডেন্টকে তিনি নির্বাচনে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু ডিক্রীর ব্যাপারে বারবার হুশিয়ার করে দেন। এই ডিক্রী জারি করা যাবে না। হিন্ডেনবার্গ তো আগে থেকেই ডিক্রীর বিরুদ্ধে ছিলেন। হিটলারের কথা শুনে তিনি নির্বাচনে দাঁড়ানোর ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেন। হিটলারকে তিনি কথা দেন, এই ডিক্রী তিনি ভুলেও জারি করবেন না।
১৯৩২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয় মূলত হিন্ডেনবার্গ এবং হিটলারের মধ্যে। কিন্তু হিন্ডেনবার্গের জনপ্রিয়তা পাহাড়সম। তাকে কি আর হারানো যায়! নাৎসি কর্তৃক ব্যপক প্রচার চালানো সত্ত্বেও, ভোট গ্রহণের পর দেখা যায়, হিন্ডেনবার্গ পেয়েছেন ১,৮৬,৫১,৪৯৭ ভোট(৪৯.৬%) আর হিটলার পেয়েছেন, ১,১৩,৩৯,৪৪৬ ভোট(৩০.১%)।
নির্বাচনে হিন্ডেনবার্গ জিতলেও তিনি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেননি। ফলে দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ নির্বাচন ডাকা হয়। এই নির্বাচনে যে জিতবে, তিনিই হবেন প্রেসিডেন্ট। ২য় নির্বাচনের জন্যে হিটলার এবং নাৎসি পার্টি হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে। আকাশপথে তিনি প্রতিদিন জার্মানির একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে প্রচারনার কাজে যেতেন। নিজে প্রতিদিন ৪-৫টা র্যালিতে উপস্থিত থাকতেন। নাৎসিরা রেডিও মাধ্যমের মারাত্মক ব্যবহার শুরু করে। এছাড়া সমগ্র দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার গণসভা আয়োজন করা হয়।
(ছবিঃ- নির্বাচনের আগে প্রচারে হিটলার, পেছনে গোয়েবলস, ১৯৩২ সাল)
কিন্তু ২য় নির্বাচনটাও নাৎসিদের হাতছাড়া হয়ে গেলো। নির্বাচনে হিন্ডেনবার্গ পান ১,৯৩,৫৯,৯৮৩(৫৩%) ভোট। হিটলার পান ১,৩৪,১৮,৫৪৭(৩৬.৮%) ভোট। হিন্ডেনবার্গের জয়ে, চ্যান্সেলর ব্রুনিং সহ অনেক হিটলার বিদ্বেষীগণ তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলেন। যাক, এবার তো আপদ দূর হল। হিটলার নামক পাগলা ঘোড়াটিকে টানা দ্বিতীয়বারের মত আটকানো গেল, এই ভেবে তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। তার পরবর্তী লক্ষ্য, নাৎসিদের পঙ্গু করে দেওয়া। টানা দুটি পরাজয়ের কারণে এবার হিটলারের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে কমে যেতে শুরু করবে।
আগেই বলা হয়েছে, নাৎসি পার্টির S.A. নামের একটি শক্তিশালী প্যারামিলিটারি শাখা ছিল। ১৯২০ সালে, S.A প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৩২ সালের মধ্যে S.A এর সৈন্যসংখ্যা ৪ লাখ ছাড়িয়ে যায়। ভয়ঙ্কর সত্য হল এই যে, ১৯৩২ সালে S.A এর সৈন্য সংখ্যা, জার্মান আর্মি "রাইখস্ওয়ের(Reichswehr)" থেকে বেশী ছিল। S.A এর এইরূপ ক্রমাগত উত্থানে অনেকেই ভীত হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে চ্যান্সেলর ব্রুনিংও ছিলেন। ১৯৩২ সালে বিভিন্ন মহল থেকে খবর আসতে থাকে যে, নাৎসিরা S.A এর সাহায্যে একটি সশস্ত্র বিপ্লব ঘটিয়ে ক্ষমতা দখলের মতলব করছে। ক্ষমতা দখলের পর তারা S.A কে সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করবে। এরূপ সশস্ত্র বিপ্লব ঘটলে, দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। এই কারণে S.A কে থামানো দরকার।
তবে এটি ছিল নিতান্তই একটি গুজব। এর কোন শক্ত ভিত্তি ছিল না। কিন্তু নাৎসিদের থামাতে, চ্যান্সেলর ব্রুনিং এই গুজবকে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়া S.A কে থামিয়ে দিতে পারলে, হিটলারের দর্প অনেকাংশে কমে যাবে। তখন নখ-দন্তহীন নাৎসিবাদ ব্রুনিং এর স্বপ্নের জার্মান গণতন্ত্রের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
১৯৩২ সালের ১০ এপ্রিল, নির্বাচনের দিনেই ব্রুনিং আঘাত হানেন। ওই দিনেই, তিনি S.A কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। দিনের শেষে হিটলারের কাছে দুটি খারাপ খবর আসে। একটি হল, নির্বাচনে হিন্ডেনবার্গের কাছে তার পরাজয়ের খবর। আরেকটি হল, ব্রুনিং কর্তৃক S.A-কে নিষিদ্ধ ঘোষনা করার খবর। S.A কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার ফলে হিটলার মহা ফাঁপরে পড়েন। কিন্তু তিনি বিচলিত হননি। নাৎসিদের মধ্যে অনেকেই তাকে নিষিদ্ধঘোষিত S.A কে নিয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহ করার পরামর্শ দেন। কিন্তু তিনি তা আমলে নেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, নাৎসিদের জয় সময়ের ব্যপার মাত্র। সশস্ত্র বিপ্লবের মত বোকামি করে অপেক্ষার পালা দীর্ঘ করার কোনো দরকার নেই। এই সম্পর্কে নাৎসিদের প্রোপাগ্যান্ডা চীফ যোসেফ গোয়েবলস তার ডায়েরীতে লেখেন,
"ফুয়েরার সঠিক সিদ্ধান্তটিই নিয়েছেন। এখন পাগলামি করার সময় নয়। আর তাছাড়া, সরকার আমাদের আর কতদিন আটকে রাখতে পারবে? ন্যাশনাল সোশালিজ্মের জোয়ার একবার শুরু হয়ে গিয়েছে। তাকে আর থামানো যাবে না।"
নাৎসিদের এই দুঃসময়ে, তাদের ত্রানকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন লেফটেন্যান্ট জেনারেল কার্ট ভন স্লাইশার। স্লাইশার তখন ততকালীন জার্মান ডিফেন্স মিনিস্টার উইলহেম গ্রোনারের (Wilhelm Groener) অধীনে কাজ করতেন। তিনি ছিলেন মারাত্মক প্রভাবশালী ও প্রচন্ড উচ্চাভিলাষী। কুচক্রী এই জেনারেল অনেক আগে থেকেই জার্মানির চ্যান্সেলর হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।
হিটলারের সাথে বন্ধুত্ব পাতানো ছিল তার চ্যান্সেলর হওয়ার পরিকল্পনারই একটা অংশ মাত্র। নির্বাচনের অল্প কয়েকদিন পরে, হিটলারের সাথে স্লাইশারের বৈঠক হয়। সেখানে স্লাইশার তার প্রতি মিত্রতার হাত বাড়িয়ে দেন। তিনি হিটলারকে কথা দেন, যে কোনো মূল্যে S.A এর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। বিনিময়ে হিটলারকে স্লাইশারের সাথে একটি জোট সরকার গঠনের ব্যাপারে সম্মতি প্রদান করতে হবে। হিটলারের কোন উপায় ছিল না। তিনি স্লাইশারের প্রস্তাব মেনে নেন। স্লাইশার হিটলারকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, যেহেতু তারা একই পথের পথিক, সেহেতু তাদের শত্রু এক ও অভিন্ন। স্লাইশার দুজন শত্রুকে চিহ্নিত করেন। একজন হল ডিফেন্স মিনিস্টার উইলহেম গ্রোনার ও আরেকজন চ্যান্সেলর ব্রুনিং।
স্লাইশার হিটলারকে আশ্বস্ত করেন এই বলে যে, শীঘ্রই তিনি এই শত্রুদের অপসারণ করবেন। বিনিময়ে তিনি হিটলারের আনুগত্য কামনা করছেন। শিয়ালের ন্যায় ধুর্ত স্লাইশার এবার তার প্রভাব খাটানো শুরু করেন। তার কূটচালের ফাঁদে পড়ে প্রথমে নিজের পদ থেকে সরে দাড়ান ডিফেন্স মিনিস্টার গ্রোনার। ডিফেন্স মিনিস্টারকে শেষ করার পর স্লাইশার চ্যান্সেলার ব্রুনিংকে সরানোর কাজে হাত দেন।
১৯৩০ সালে যখন ব্রুনিং চ্যান্সেলর পদে নিযুক্ত হন, তখন জার্মানি বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত ছিল। চরম বৈরী পরিস্থিতিতে তিনি দেশের হাল ধরেছিলেন। ১৯৩০ সালের ওয়াল স্ট্রীট অর্থনৈতিক ধস, জার্মান অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। ব্রুনিং নিজ হাতে দেশের এই নাজুক পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন। এছাড়া ভার্সাই চুক্তি অনুসারে, জার্মানিকে প্রতি বছর একটি বিরাট অঙ্কের অর্থ, ১ম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে হত। ব্রুনিং এর আমলে, এই বাৎসরিক ক্ষতিপূরণ মোটামুটি প্রদানযোগ্য পরিমানে নেমে আসে। কিন্তু জার্মানির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলেও, ব্রুনিং জার্মান বেকারত্ব দূর করতে পারেননি। ব্রুনিং এর আমলে জার্মানিতে প্রায় ৬০লাখ মানুষ বেকার ছিলেন।
১৯৩০ সালে চ্যান্সেলর হওয়ার পর থেকে, ব্রুনিং অসংখ্যবার সংবিধানের ৪৮নং ধারার আশ্রয় নিয়েছিলেন। এর ফলে ব্রুনিং এর ভাবমুর্তিতে যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। সংবিধানের ৪৮ নং ধারা অনুযায়ী, দেশের সংকট নিরসনের লক্ষ্যে, একজন চ্যান্সেলর নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে তার প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিবলে শাসন কার্য চালাতে পারবেন। নিজ বিবেচনায় বিভিন্ন আইন পাশ করার জন্যে ব্রুনিং বারবার এই ধারা জারি করতেন। এমনকি S.A এর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্যে তিনি এই ধারার আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই ধারাকে এক প্রকার স্বৈরাচারীতন্ত্র বলা চলে।
ততকালীন জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চলে, জমিদার প্রথা বর্তমান ছিল। চ্যান্সেলর ব্রুনিং, ব্যাঙ্ক কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত জমিদার পরিবারের জমিগুলোকে বাজেয়াপ্ত করে, গরীব কৃষক শ্রেনীর মাঝে বন্টন করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে, ব্রুনিং জার্মানির অভিজাত প্রাশিয়ান শ্রেনীর চক্ষুশূল হন। তারা তাকে কমিউনিস্ট আখ্যা দেয়। অভিজাতেরা প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গের কাছে ব্রুনিং এর পদত্যাগের জন্যে ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে। এমনই এক সময়ে, অভিজাতদের সাহায্য করার জন্যে এবং সেই সাথে নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্যে, ব্রুনিং এর বিরুদ্ধে মাঠে নামেন স্লাইশার।
স্লাইশার বৃদ্ধ প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গকে বুঝাতে সক্ষম হন যে, ব্রুনিং চ্যান্সেলর হিসেবে থাকলে, জার্মানিতে কখনো শান্তি নেমে আসবে না। কেননা ব্রুনিং এর সাথে হিটলারের সাপে-নেউলে সম্পর্ক। হিটলারকে শান্ত করতে হলে, ব্রুনিংকে অবশ্যই সরে যেতে হবে। তাছাড়া চ্যান্সেলর হিসেবে ব্রুনিং এর বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকান্ড তো আছেই। অল্প কয়েকদিন পড়ে, ব্রুনিং পুনরায় ৪৮ নং ধারা জারি করার জন্যে প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গের অনুমতি প্রার্থনা করেন। এতে প্রেসিডেন্টের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। তিনি অনুমতি প্রদানে অস্বীকৃতি জানান। প্রেসিডেন্টের এরূপ ব্যবহারে আহত ব্রুনিং সেই দিনেই তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে বেরিয়ে আসেন। ব্রুনিং এর পদত্যাগে জার্মান গণতন্ত্র আক্ষরিক অর্থেই শেষ হয়ে যায়।
(ছবিঃ- ফ্রাঞ্জ ভন পাপেন)
ব্রুনিং এর পদত্যাগের পর, জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে নিযুক্ত হন স্লাইশারের পছন্দ ফ্রাঞ্জ ভন পাপেন(Franz von Papen) নামক অভিজাত শ্রেনীর একজন লোক। এর অল্প কয়েকদিন পরে হিটলারের সাথে প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গের বৈঠক হয়। হিন্ডেনবার্গ হিটলারের কাছে জানতে চান যে, পাপেনকে চ্যান্সেলর হিসেবে মেনে নিতে তার কোনো আপত্তি আছে কিনা। মেনে নিলে S.A এর উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে এবং সেই সাথে নতুন চ্যান্সেলরের অধীনে জাতীয় নির্বাচন ডাকা হবে। হিটলার বিনা বাক্যব্যয়ে প্রেসিডেন্টের সব কথা মেনে নেন। এরপরের দিন, S.A এর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় এবং সেই সাথে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে পুনরায় জাতীয় নির্বাচন ডাকা হয়।
নাৎসিদের জন্যে এটি ছিল এক বছরের মধ্যে তৃতীয় নির্বাচন। এর আগের দুটো ছিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তাতে তারা হেরে যায়। কিন্তু ৩য় এই নির্বাচনটি হল জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্যে নাৎসিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু নাৎসিদের নির্বাচনী কার্যক্রম সব ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ ছিল না। S.A এর কমান্ডার আর্নস্ট রোমের নেতৃত্বে, S.A বাহিনী জার্মানির রাস্তায় রাস্তায় ত্রাসের সৃষ্টি করে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ক্যাডার বাহিনীগুলোর সাথে S.A এর সৈন্যদের প্রায় প্রতিদিন সংঘর্ষ হত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খুনোখুনি পর্যন্ত হয়ে যেত। ১৯৩২ সালের ১৯শে জুলাই, S.Aএর একটি বিশাল বাহিনী, বার্লিনের কমিউনিস্ট অধ্যুষিত এলাকায় মিছিল করে। মিছিলটি ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং উস্কানিমূলক। ফলে, অবধারিতভাবে S.A এর সাথে কমিউনিস্টদের সংঘর্ষ বাঁধে। পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই সংঘর্ষে ১৯ জন নিহত হয় এবং উভয় পক্ষের শতাধিক লোক আহত হয়। দিনটি ছিল রবিবার। ইতিহাসে এই দিন "Bloody Sunday" নামে আখ্যায়িত।
১৯৩২ সালের এই ৩য় নির্বাচনে, নাৎসিরা বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়। হিটলারের নাৎসি পার্টি মোট ১,৩৭,৪৫,০০০টি ভোট পায়। এটি মোট ভোটারের ৩৭%। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এই যে, বিরাট জয় পেলেও তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। যার কারণে হিটলারের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। একটি হল, দ্বিতীয় কোনো পক্ষের সাথে জোট সরকার গঠন করা। অপরটি হল, পুনরায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা।
এমতাবস্থায় হিটলার স্লাইশারের সাথে জরুরি বৈঠকে বসেন। তিনি স্লাইশারকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত কিছু দাবি পেশ করেন। তিনি বলেন যে, তিনি জোট সরকার গঠন করতে রাজি আছেন, তবে অবশ্যই তাতে তাকে চ্যান্সেলর পদ দিতে হবে। শুধু তাই নয়, ব্রুনিং আর পাপেনের মত তাকেও সংবিধানের ৪৮ নং ধারার আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এছাড়া, নাৎসিদেরকে কমপক্ষে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। সেই সাথে প্রোপ্যাগান্ডা মন্ত্রনালয় নামক একটি নতুন মন্ত্রনালয় খুলতে হবে, এবং তার দায়িত্ব দিতে হবে যোসেফ গোয়েবলসকে। স্লাইশার হিটলারের কথা চুপচাপ শুনে যান। দাবিগুলোর ব্যপারে তিনি ভেবে দেখবেন, এই বলে তিনি বেরিয়ে আসেন।
হিটলার স্লাইশারের কাছ থেকে সুসংবাদ আশা করছিলেন। কিন্তু তার কাছ থেকে দুঃসংবাদ আসে। বেশ কিছুদিন পর স্লাইশার হিটলারের সাথে দেখা করেন। তার সাথে পাপেনও ছিল। স্লাইশার হিটলারকে জানান যে তারা হিটলারের প্রস্তাবগুলো ভেবে দেখেছেন। কিন্তু দেশের স্বার্থে তারা হিটলারের দাবিগুলো মেনে নিতে পারছেন না। তারা বড়জোর হিটলারকে ভাইস চ্যান্সেলর পদ প্রদান করতে পারেন। এবার হিটলার মারাত্মক রেগে যান। তিনি প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গের কাছে নালিশ করার হুমকি দেন। কিন্তু স্লাইশার এবং পাপেন নির্লিপ্ত থাকেন। পাপেন বলে উঠেন যে, হিন্ডেনবার্গের কাছে নালিশ করতে যাওয়াটা বোকামি হবে কারন, প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ S.A এর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্যে তিনি হিটলারের উপর মারাত্মক রেগে আছেন। পাপেনের এই কথায় হিটলারের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। উদ্ভ্রান্তের মত তিনি বলে উঠেন যে, তার দলকে থামানো যাবে না। প্রয়োজনে তিনি সর্বশক্তি প্রয়োগ করবেন। S.A কে লেলিয়ে দিবেন। তার দল ক্ষমতায় আসবেই।
এই ঘটনার কয়েকদিন পরে প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ হিটলারকে তলব করেন। প্রেসিডেন্ট এতটাই রাগান্বিত ছিলেন যে তিনি হিটলারকে চেয়ারে বসার অনুমতি পর্যন্ত দেননি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হিটলারকে প্রেসিডেন্টের গালিগালাজ হজম করতে হয়। প্রেসিডেন্টের কক্ষ থেকে বেরিয়ে হিটলার বলেন, "আমি শুধুমাত্র চ্যান্সেলরের পদ এবং সেই সাথে কয়েকটি মন্ত্রনালয় চেয়েছিলাম। একনায়কতন্ত্র কায়েম করতে তো আমি চাইনি।"
হিটলারের একরোখা নীতির কারণে, কোন জোট সরকারই গঠন করা গেল না। এ কারণে চ্যান্সেলর পাপেন পুনরায় নির্বাচন ডাক দেন। নাৎসিদের জন্যে সেপ্টেম্বরের এই নির্বাচন ছিল এক বছরের মধ্যে টানা চতুর্থ নির্বাচন। অবসাদ তাদের অবধারিতভাবে পেয়ে বসে। এত বেশী নির্বাচনের কারণে সকলেই হাপিয়ে উঠেছিল। আগের সেই উদ্দাম উদ্দীপনা ছিল না। এছাড়া একটি বড় সমস্যা দেখা দেয়। তা হল অর্থাভাব। এক বছরের মধ্যে এতগুলো নির্বাচনের কারণে নাৎসিদের কোষাগার শূন্য হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে, S.A এর তান্ডবের কারণে, ভোটের পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও অনেকে করতে থাকেন।
নাৎসিদের প্রোপ্যাগান্ডা চীফ গোয়েবলস তার ডায়েরীতে লিখেন,
"আবারো নির্বাচন! আমরা এবার নির্ঘাত পাগল হয়ে যাবো.........। পরিস্থিতি সব দিক দিয়ে খারাপ। আমাদের কাছে তেমন অর্থ নেই। শিল্প গোষ্ঠীগুলোর ধৈর্যচ্যুতি হয়েছে বোধহয়। ফলে অনুদানও তেমন আসছে না।এভাবে একটা দল চালানো যায় না।"
নির্বাচনে এবারও নাৎসিদের হারানো গেল না। কিন্তু সবার আশঙ্কা সত্যি হল। নাৎসিরা এবার জিতেছে ঠিকই, কিন্তু অনেক কম ভোট পেয়ে। পুর্বের নির্বাচনের তুলনায় তারা প্রায় বিশ লাখ ভোট কম পেয়েছে। S.A এর আগ্রাসী কর্মকান্ড এবং নিজেদের প্রচারণার অভাবের কারণেই এমনটি হয়েছে। বুঝতে অসুবিধা হল না যে, নাৎসিরা সমর্থন হারাচ্ছে। অনেকেই তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। নাৎসিদেরকে এবার জোট গঠন করতেই হবে। চরম এই দুঃসময়ে, নাৎসিরা হঠাৎ অপ্রত্যাশিত সাহায্য পায়। নাৎসিদের পক্ষ নিয়ে, দেশের বড় বড় শিল্পপতিগণ হিন্ডেনবার্গের কাছে একটি পিটিশন পাঠায়। সেখানে হিটলারকে চ্যান্সেলর পদ প্রদানের জন্যে অনুরোধ করা হয়। শিল্পপতিরা বিশ্বাস করতেন যে, হিটলার ক্ষমতায় আসার পর ব্যবসা বাণিজ্যের ভালো প্রসার ঘটাবেন। এই কারণে তারা এই কাজটি করেন।
জার্মানির এরূপ অচলবস্থা কাটাতে, নির্বাচনের কয়েকদিন পর প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ, পাপেন এবং স্লাইশারের সাথে বৈঠকে বসেন। সেখানে পাপেন প্রেসিডেন্টের কাছে একটি কঠিন প্রস্তাব করেন। প্রেসিডেন্টের কাছে তিনি প্রস্তাব করেন যে তাকে জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে বহাল রাখা হোক এবং সেই সাথে ৪৮নং ধারার প্রেসিডেনশিয়াল ডিক্রী তথা নিজের বিচার বুদ্ধি অনুসারে শাসনকার্য চালানোর ব্যবস্থাটি স্থায়ী করা হোক। তখন তিনি আর্মি এবং পুলিশকে ব্যবহার করে সকল গোঁয়ার রাজনৈতিক দলকে শেষ করে দেবেন এবং পরে যখন দেশের অচল অবস্থা কেটে যাবে তখন তিনি শাসনক্ষমতা জার্মানির রাজ পরিবারের কাছে অর্পণ করবেন। এর ফলে দেশে এককালের জনপ্রিয় রাজতন্ত্র ফিরে আসবে।
কিন্তু স্লাইশার পাপেনের প্রস্তাব মেনে নিতে পারলেন না। উলটে, তিনি নতুন চাল চালেন। তিনি নিজেকে চ্যান্সেলর বানানোর দাবি জানান। তার কথা শুনে প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ তাজ্জব বনে যান। স্লাইশার বলেন যে, নাৎসিরা নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। জোট সরকার করতে হলে তো তাদের সাথেই করতে হবে । স্লাইশার প্রেসিডেন্টকে আরও বলেন যে তিনি নাৎসিদেরকে জোটের আওতায় আনতে পারবেন। তিনি নাৎসিদের মাঝে অন্তঃকোন্দল সৃষ্টি করে তাদের দু ভাগ করে ফেলবেন। এরপর এক পক্ষের সাথে তিনি জোট গঠন করবেন। কিন্তু ওই দিন বিকেলবেলা, কুচক্রী স্লাইশার প্রেসিডেন্টের সাথে পুনরায় দেখা করেন। তাকে চ্যান্সেলর না বানালে তার নেতৃত্বে গোটা সেনাবাহিনী বিদ্রোহ করবে, এই বলে তিনি হুমকি দেন। এই হুমকিতে কাজ হয়। হিন্ডেনবার্গ তার দাবি মেনে নেন।
সেই রাতে হিন্ডেনবার্গ পুনরায় পাপেনকে তলব করেন। পাপেন বিকেলের ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। প্রেসিডেন্ট কক্ষে ঢুকে তিনি হিন্ডেনবার্গের চোখে অশ্রু দেখতে পান। প্রেসিডেন্ট পাপেনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "প্রিয় পাপেন, আমি জানি যে আমি সিদ্ধান্ত পাল্টালে তুমি কিছু মনে করবে না। কিন্তু কি করার আছে বলো? এই বৃদ্ধ বয়সে একটা গৃহযুদ্ধ সামলানোর মত শক্তি আমার দেহে নেই।" পাপেন তার কথা মেনে নেন। সেই সাথে, যে কোন মূল্যে স্লাইশারকে ধ্বংস করবেন বলে প্রেসিডেন্টকে তিনি কথা দেন। পরের দিন, ১৯৩২ সালের ২ ডিসেম্বর সবাইকে অবাক করে দিয়ে কুচক্রী স্লাইশার জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে শপথ নেন। চ্যান্সেলর হবার তার পরম আরাধ্য স্বপ্ন অবশেষে পূরণ হল। তিনি প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গকে কথা দিয়েছিলেন যে নাৎসিদের তিনি বিভক্ত করে ফেলবেন। দেরি না করে তিনি এই কাজে নেমে পড়েন।
(ছবিঃ- গ্রেগর স্ট্রাসার)
সেই সময় নাৎসি পার্টির Second-in-command ছিলেন গ্রেগর স্ট্রাসার(Gregor Strasser)। ১৯২০ সাল থেকে তিনি নাৎসিদের সাথে ছিলেন। চমৎকার সাংগঠনিক ক্ষমতার অধিকারী এই ব্যক্তি অনেকের কাছে হিটলারের চেয়েও জনপ্রিয় ছিলেন। এছাড়া তিনি ছিলেন হিটলারের মতই চমৎকার বক্তা। অনেকেই পার্টির নেতা হিসেবে হিটলারের বদলে তাকে অধিকতর যোগ্য মনে করতেন। স্ট্রাসার হিটলারকে অপছন্দ করতেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও, পার্টির স্বার্থে তিনি তাকে মান্য করতেন। অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, স্ট্রাসার ছিলেন প্রকৃত ন্যাশনাল সোশিয়ালিজম ভাবধারার অনুসারী। হিটলার ন্যাশনাল সোশালিস্ট হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করলেও পরে একনায়কতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ধূর্ত স্লাইশার, স্ট্রাসার এবং তার অনুরাগীদের নাৎসিদের থেকে বিচ্যুত করার পরিকল্পনা করেন।
স্লাইশার একদিন স্ট্রাসারের সাথে গোপন বৈঠকে বসেন। তিনি স্ট্রাসারকে ভাইস চ্যান্সেলর পদ প্রস্তাব করেন। যারা যারা তার সাথে নাৎসিদের থেকে বেরিয়ে আসবে, তারাও উচ্চ পদ পাবে বলে স্লাইশার আশ্বাস দেন। কিন্তু স্ট্রাসার কোনভাবেই স্লাইশারের প্রস্তাবে রাজি হলেন না। তিনি নাৎসিদের একান্ত অনুগত। কিন্তু তিনি স্লাইশারকে কথা দেন যে, স্লাইশারের সাথে জোট গঠনের ব্যপারে তিনি হিটলারকে উদ্বুদ্ধ করবেন। স্লাইশারের সাথে স্ট্রাসারের এই গোপন বৈঠক বেশীদিন গোপন থাকল না। স্ট্রাসার হিটলারের সাথে আলাপ আলোচনা করার আগেই বৈঠকের খবর ফাঁস হয়ে যায়। উল্টো হিটলার স্ট্রাসারকে তলব করে বসেন ও স্ট্রাসারের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেন। তিনি স্ট্রাসারকে বিশ্বাসঘাতক বলে আখ্যায়িত করেন। স্ট্রাসারও কম যান না। তিনিও হিটলারকে আক্রমণ করেন। হিটলারের গোয়ার্তুমি আর স্বৈরাচারী মনোভাবের কারণেই দেশে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এরপর স্ট্রাসার হিটলারকে স্লাইশারের সাথে জোট বাঁধতে অনুরোধ করেন। স্ট্রাসারের এই কথায় হিটলার রাগে ফেটে পড়েন। চরম গালিগালাজ করেন তিনি। সব শেষে, হিটলার স্ট্রাসারকে আজীবনের জন্যে দূরে সরে যেতে বলেন। সেই রাতেই স্ট্রাসার তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে বেরিয়ে আসেন। ফলে নাৎসিরা একজন সৎ ও মানবতাবাদী নেতাকে হারায়।
স্ট্রাসারের এরূপ আকস্মিক পদত্যাগে নাৎসিদের মাঝে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। সকলেই আফসোস করতে থাকেন। এমনকি হিটলার, যিনি নিজে তাকে রাগের মাথায় বের করে দিয়েছেন, তিনিও বিমর্ষ হয়ে পড়েন। অনেকে বলাবলি করতে থাকেন যে স্ট্রাসার এবার স্লাইশারের সাথে হাত মিলাবেন। কিন্তু স্ট্রাসার স্লাইশারের সাথে জোট বাঁধেননি। তিনি রাজনৈতিক জীবন থেকে ইস্তফা দিয়ে ইটালিতে ছুটি কাটাতে চলে যান। এতে নাৎসিরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। অন্যদিকে, নাৎসিদের বিভক্ত করার স্লাইশারের পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যায়। চলে যাওয়ার আগে স্ট্রাসার রাগে দুঃখে তার অনুরাগীদের বলে যান,
"তোমরা জেনে রাখো, আজ থেকে গোটা দেশের ভাগ্য একজন মিথ্যুক "বোহেমিয়ান কর্পোরালের"(হিটলার) হাতে, একজন সমকামী বিকৃত মস্তিষ্কের অধিকারীর(S.A নেতা এর্ন্স্ট রোম) হাতে আর একজন খোঁড়ার(প্রোপ্যাগান্ডা চীফ যোসেফ গোয়েবলস) হাতে। এদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে শেষের জন। সে মানুষ না, সে মানুষরূপী শয়তান।"
"The enemy of my enemy is my friend" এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে প্রতিশোধপরায়ণ পাপেন, স্লাইশারের বিরুদ্ধে নতুন চাল চালেন। স্লাইশারকে সরাতে তিনি হিটলারের দারস্থ হন।
স্লাইশার ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক এক মাস দুই দিন পর, ১৯৩৩ সালের ৪ জানুয়ারি, পাপেন হিটলারের সাথে গোপন বৈঠক করেন। তিনি হিটলারকে জোটের প্রস্তাব দেন। এখানেও হিটলার তার পূর্বের দাবিগুলো করেন। চ্যান্সেলরশীপ আর তিনটা মন্ত্রনালয়। সবাইকে অবাক করে দিয়ে পাপেন এবার হিটলারের কথায় রাজি হয়ে যান। কিন্তু এই গোপন বৈঠকের কথা স্লাইশার গোয়েন্দা মারফত জেনে ফেলেন। তিনি প্রেসিডেন্টের কাছে দ্রুত অভিযোগ করেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট স্লাইশারের কথায় কান না দিয়ে চুপ থাকেন। উল্টো তিনি স্লাইশারকে নাৎসিদেরকে বিভক্ত করতে না পারার জন্যে দোষী সাব্যস্ত করেন। স্লাইশার তখন প্রেসিডেন্টকে বলেন যে নাৎসিরা পাপেনের সহায়তায় ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। তাদেরকে আটকাতে তিনি প্রেসিডেন্টকে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করার অনুরোধ করেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ছিলেন নির্বিকার। তিনি স্লাইশারের কথায় কান দিলেন না। প্রেসিডেন্ট তখন তাচ্ছিল্য ভরে স্লাইশারকে নাৎসিদেরকে বিভক্ত করার ব্যাপারে তার লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যেতে বলেন।
স্লাইশার বুঝতে পারেন যে প্রেসিডেন্ট তাকে খোঁচা দেওয়ার জন্যে এমনটি বলেছেন। তিনি জানেন যে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। অবশেষে ক্ষমতায় আসার ৫৭ দিন পর প্রেসিডেন্টের সমর্থন হারানো স্লাইশার, ব্যর্থতার দায়ভার মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন। স্লাইশারের পদত্যাগের ফলে চ্যান্সেলরের পদ খালি হয়ে যায়। ২৮শে জানুয়ারি, পাপেন হিন্ডেনবার্গের কাছে যান এবং হিটলারকে চ্যান্সেলর বানানোর জন্যে অনুরোধ করেন। নিজে ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে তিনি সবসময় হিটলারের উপর চোখ রাখবেন বলে প্রেসিডেন্টকে আশ্বাস দেন।
১৯৩৩ সালের ২৯ শে জানুয়ারি, হঠাৎ করে চারিদিকে ভুয়া গুজব উঠে যে স্লাইশার আর্মিকে নিয়ে বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখলের পায়তারা করছে। এতে প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে এবং তিনি হিটলারকে চ্যান্সেলর এবং তাকে নজরে রাখার জন্যে পাপেনকে ভাইস চ্যান্সেলর বানানোর মনস্থির করে ফেলেন। পরের দিন তিনি নাৎসিদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি, আনুমানিক সকাল ১১টায় বার্লিনের প্রেসিডেন্ট হাউসে, অ্যাডলফ হিটলার জার্মান চ্যান্সেলর হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি বলেন-
"I will employ my strength for the welfare of the German people, protect the Constitution and laws of the German people, conscientiously discharge the duties imposed on me, and conduct my affairs of office impartially and with justice to everyone."
হিটলার জার্মানদের সামগ্রিক কল্যাণের জন্যে নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগের শপথ নেন। তিনি জার্মানির সংবিধান এবং আইন রক্ষার অঙ্গীকার নেন। তিনি অঙ্গীকার করেন ন্যায়বিচার এবং নিরপেক্ষতার। এভাবে, অ্যাডলফ হিটলারকে জার্মানির গণতান্ত্রিক সরকারের চ্যান্সেলর হিসেবে গ্রহণ করা হয়। যে মানুষ তার রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই গণতন্ত্রকে ঘৃণা করে আসছিলেন, সেই মানুষই গণতান্ত্রিক সরকারের চ্যান্সেলর পদে নির্বাচিত হলেন! প্রকৃতির কি অদ্ভুত খেয়াল।
দীর্ঘ ১৩ বছর সংগ্রামের পর এই সাফল্য আসে। এরই মাঝে হিটলার ও তার দলকে পার হতে হয়েছিল অনেক বন্ধুর পথ। হিটলার যখন দলের হাল ধরেন তখন দলের সদস্য সংখ্যা ছিল ৫৫ জন। কোষাগার ছিল শূন্য। একেবারে শূন্য থেকে উঠে এসেছিলেন তিনি। তবে এ কথা না বললেই নয় যে, শুধু হিটলার নন, সেই সময় নাৎসি পার্টিতে হিটলারের সমসাময়িক অনেক মেধাবী মুখের সমাগম হয়েছিল। তারা নিজেদের কাজে অবাক করা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। হিটলারের প্রতি তাদের অনুগত্য ছিল কিংবদন্তিতুল্য। এই মেধাবী অনুসারীদের নিয়েই, হিটলার ১৯৩৩ সাল থেকে তার "স্বপ্নের থার্ড রাইখ" গড়ে তুলবার কাজে লেগে পড়েন।
হিটলার ছিলেন গণতান্ত্রিক সরকারের শেষ চ্যান্সেলর। তার আগে যারাই গণতান্ত্রিক সরকারের চ্যান্সেলর হিসেবে এসেছিলেন, তাদের প্রত্যেকেই, চ্যান্সেলর হিসেবে করা উপর্যুক্ত শপথ ভঙ্গ করেছিলেন। হিটলারও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। চ্যান্সেলর নির্বাচিত হবার কয়েক মাসের মধ্যে, তিনি নিজে জার্মানদের দুঃস্বপ্ন, তথা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেন এবং সমস্ত ক্ষমতা নিজে এবং নিজের দলের কাছে কুক্ষিগত করেন।
(ছবিঃ- উপরে, চ্যান্সেলর হিসেবে শপথগ্রহনের পর ন্যুরেমবার্গে ভক্তদের হিটলারকে অভিবাদন দান; নীচে, নবনিযুক্ত চ্যান্সেলর হিটলার ও তাঁর মন্ত্রীসভার সদস্যবর্গ, ১৯৩৩ সাল)
১৯৩৩ সালের ৩০শে জানুয়ারি যে সরকার গঠন করা হয়, সে সরকারে নাৎসিদের একচেটিয়া দাপট ছিল না। কেননা এটি ছিল একটি কোয়ালিশন সরকার। নাৎসিদের সাথে যৌথভাবে সরকার গঠন করেছিল "ন্যাশনাল পার্টি"। হিটলার ছিলেন এই সরকারের চ্যান্সেলর। ভাইস চ্যান্সেলরের পদে ছিলেন ন্যাশনাল পার্টির ফ্রাঞ্জ ভন পাপেন। প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ শুধুমাত্র পাপেনের অনুরোধেই হিটলারকে চ্যান্সেলর করতে রাজি হয়েছিলেন। হিন্ডেনবার্গ পাপেনকে ভাইস চ্যান্সেলর পদে রেখেছিলেন হিটলারকে নজরে রাখার জন্যে।
চ্যান্সেলর হিসেবে হিটলারের পদটি বাদে, এই জোট সরকারে নাৎসি মন্ত্রী ছিলেন মাত্র দুজন- গোয়েরিং এবং উইলহেম ফ্রিক। হিটলারের লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি মারাত্মক বাঁধা। যে করেই হোক না কেন সরকারের মধ্যে নিজেদের দাপট বাড়াতে হবে। তা না হলে পরবর্তীতে একচ্ছত্র ক্ষমতা দখল করাটা কঠিন হয়ে যাবে।
হিটলার তার দলের এই সীমাবদ্ধতার কথা ভালো করেই জানতেন। কিন্তু তিনি দ্রুত এর সমাধান বের করে ফেলেছিলেন। চ্যান্সেলর হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের দিনেই, তিনি তার ক্যাবিনেটের সমস্ত মন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। এই জোট সরকার ক্ষমতায় বসেছে ঠিকই, কিন্তু পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠটা অর্জনের লক্ষ্যে হিটলার পুনরায় নির্বাচনের আহ্বান করেন। কিন্তু ন্যাশনালিস্ট পার্টির মন্ত্রীরা তার এই কথায় রাজি হলেন না। তারা হিটলারকে বিকল্প পন্থা অবলম্বন করতে বলেন। তারা জার্মানির অন্য একটি দল, তথা "সেন্ট্রাল পার্টিকে", এই জোটের আওতায় আনার প্রস্তাব দেন। তৎকালীন সময়ে পার্লামেন্টে সেন্ট্রাল পার্টির ৭০টি সীট ছিল। সেন্ট্রাল পার্টি জোটে আসলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এর ফলে নির্বাচনেরও আর প্রয়োজন পড়ে না।
ন্যাশনালিস্ট পার্টির মন্ত্রীদের দেওয়া এই সমাধান বরাবরই যুৎসই ছিল। কিন্তু হিটলারের চাহিদা এতে পূর্ণ হয় না। সেন্ট্রাল পার্টি ক্ষমতায় আসলে, ক্ষমতা কুক্ষিগত করা তো দূরের কথা, উল্টো তাদের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে হবে। হিটলার সরাসরি এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। এই পদ্ধতি অবলম্বন করা যাবে না। কিন্তু ন্যাশনালিস্ট পার্টির মন্ত্রীদের মারাত্মক জোরাজুরিতে হিটলার সেন্ট্রাল পার্টির সাথে আলোচনায় বসতে রাজি হন। ন্যাশনালিস্ট পার্টির মন্ত্রীরা হিটলারকে কথা দেন যে, সেন্ট্রাল পার্টির সাথে আলোচনা ব্যর্থ হলে তবেই তারা নির্বাচনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিবেন। একদিন হিটলার সেন্ট্রাল পার্টির সাথে আলোচনায় বসেন। আলোচনা শেষে, তিনি বিজয়ীর বেশে বেড়িয়ে আসেন। কেননা আলোচনা ব্যর্থ করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে নতুন একটি নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আর কোন বাঁধাই রইল না।
১৯৩৩ সালের ৫ই মার্চ নির্বাচনের তারিখ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। নির্বাচন নিয়ে নাৎসিরা মারাত্মক আত্মবিশ্বাসী ছিল। হিটলার চ্যান্সেলর হওয়ায় এতে সুবিধা হয়েছে। নাৎসিদেরকে এবার আর্থিক দুশ্চিন্তা করতে হবে না। এছাড়া দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা নাৎসিদেরকে বরাবরের মতই সমর্থন দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি করছে দেশের মধ্যবিত্ত সমাজ। হিটলার যতই বেকারত্ব নির্মূল, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের হারের প্রতিশোধের অঙ্গীকার করুক না কেন, মধ্যবিত্তদের মধ্যে একটি বিরাট অংশ নাৎসিদের এড়িয়ে চলত। তাদের সমর্থন ছাড়া অবশ্য নির্বাচনে জেতা সম্ভব, কিন্তু পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব নয়। এছাড়া রয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি। পার্লামেন্টে তাদের ১০০টি সীট রয়েছে। এদের সাথে জোট গঠনের প্রশ্নই আসে না। নির্বাচনে জেতার জন্যে হিটলারের কাছে দুটো উপায় আছে। এক, যে করে হোক, মধ্যবিত্তদের সমর্থন অর্জন করা। দুই, কমিউনিস্টদের ধ্বংস করে ফেলা। এতে ১০০টি সীট খালি হবে। হিটলার সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি এক ঢিলে দুই পাখি মারবেন।
হিটলার কমিউনিস্ট পার্টিকে ধ্বংস করার মাধ্যমে, জার্মানির ত্রাণকর্তা হিসেবে, দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে নাৎসি পার্টিকে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু কমিউনিস্টদের ধ্বংস করতে হলে, তাদের ধ্বংস করার পিছনে একটা কারণ দরকার।
হিটলার সিদ্ধান্ত নিলেন সব ধরণের কমিউনিস্ট নির্বাচনী প্রচারণা, পাবলিক মিটিংকে অবৈধ ঘোষণা করার। তিনি আশা করছিলেন যে, নির্বাচনের আগে আগে কমিউনিস্টদের উপর এরূপ নিষেধাজ্ঞা জারি করার কারণে কমিউনিস্টরা বিপ্লব করে বসবে। ফলে রাষ্ট্রে অশান্তি সৃষ্টির জন্যে তাদের দায়ী করা যাবে। ত্রাণকর্তা হিসেবে নিজেকে জাহির করাও যাবে। কিন্তু কমিউনিস্টরা হিটলারের এই ফাঁদে পা দিল না। তারা নীরবে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারটি মেনে নিল। অল্প কয়েকটি জায়গায় নির্বাচনী সভা যদিও বা হয়েছিল, কিন্তু নাৎসিরা তা পন্ড করে দেয়।এবার হিটলার বিপাকে পড়ে যান। কমিউনিস্টদের পুরোপুরি অবৈধ ঘোষণা করার জন্যে, তাদেরকে জার্মানি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্যে কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেকে কারণের তোয়াক্কা না করে সরাসরি কাজ সম্পাদনের প্রস্তাব দেন। কিন্তু হিটলার এতে সায় দিচ্ছিলেন না। তার মূল টার্গেট ছিল মধ্যবিত্ত জনগণ। কমিউনিস্টদের কোন কারণ ছাড়া ধ্বংস করলে, উল্টো নাৎসিরাই ভিলেনে পরিণত হবে।
তবে কি কমিউনিস্টদের ধ্বংস করার পিছনে কোন যুতসই কারণ খুজে পাওয়া গেল না? যদি কোন কারণ কোথাও খুঁজে পাওয়া নাও যায়, তবে তো একটি কারণ বানিয়ে নিতে কোনো বাঁধা থাকে না !!
১৯৩৩ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী, বার্লিন।
সন্ধ্যা ৭টা।
রাইখস্টাগ তথা পার্লামেন্ট ভবন থেকে কিছু দূরে, ঐতিহ্যবাহী হেরেনক্লাব রেস্টুরেন্টে, জার্মানির অতি গুরুত্বপূর্ণ দুজন ব্যক্তি রাতের খাবার সেরে নিচ্ছিলেন। তারা হলেন, প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ এবং ভাইস চ্যান্সেলর ফ্রাঞ্জ ভন পাপেন। হঠাৎ করে হেরেনক্লাবের উপস্থিত সকল অতিথিগণ, রাস্তায় অসংখ্য মানুষের শোরগোল শুনতে পেল। যারা জানালার পাশে ছিলেন, তারা সকলেই আকাশে রক্তিম আভা দেখতে পেলেন। রাস্তায় মানুষ 'আগুন, আগুন' বলে চেঁচাতে লাগলো।
(ছবিঃ- বাঁদিকে - রাইখস্টাগে অগ্নিকান্ড; ডানদিকে- অগ্নিকান্ডের পর)
পাপেন তার ডায়েরীতে লেখেন,
"হঠাৎ করে আমি রাস্তায় অনেক মানুষের শোরগোল শুনি। বাহিরে জানালা দিয়ে রক্তিম আভা চোখে পড়ছিল। এটি রাইখস্টাগ থেকে আসছিল। লোকজন রাইখস্টাগ অভিমুখে ছুটছিল। কিছুক্ষণ পরে আমি অবাক হয়ে দেখলাম, রাইখস্টাগের গম্বুজটিকে আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করেছে। এরই মাঝে একজন ওয়েটার আমাকে এসে বলল যে রাইখস্টাগে ভয়াবহ আগুন লেগেছে। আমি আর দেরি না করে প্রেসিডেন্টকে নিয়ে সরাসরি সেখানে উপস্থিত হলাম।"আমরা পৌঁছানোর সাথে সাথে হিটলার এবং গোয়েবলস এসে উপস্থিত হন। গোয়েবলস বলল যে, সে হাফেন্সস্টাগেলের কাছ থেকে খবর পেয়েছে। আমাদের আগে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন নাৎসি মন্ত্রী হেরমান গোয়েরিং।"
আমরা নামার সঙ্গে সঙ্গে গোয়েরিং চিৎকার করে উদ্ভ্রান্তের মত বলে উঠলেন, "এটা স্পস্ট কমিউনিস্টদের কাজ!!! আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে। আমরা অনেকদিন ধরে এরূপ কিছুর সন্দেহ করছিলাম।"
পাপেন এরপর তার ডায়েরীতে লিখেন,
"এরপর, ঘটনাস্থলে গেস্টাপো প্রধান রুডলফ ডাইলস্ (Rudolf Diels) এসে উপস্থিত হন। গোয়েরিং আমাদের সামনে তাকে বললেন, "কমিউনিস্ট বিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছে। এটা তারই প্রমাণ। আমাদের আর দেরি করার অবকাশ নেই। আমরা কাউকে ক্ষমা করব না। সবগুলো কমিউনিস্টকে গুলি করে মারা হবে। সবগুলোকে ফাসি দেওয়া হবে।"
অবশেষে, কমিউনিস্টদের ধ্বংস করার জন্যে পরম আরাধ্য একটি কারণ খুজে পাওয়া গেল।
রাইখস্টাগ অগ্নিকান্ডের কয়েকদিন আগে, হিটলারের S.A বাহিনী, জার্মানির একটি বারে, ম্যারিনাস ভ্যান ডার লুভ(Marinus van der Lubbe) নামক একজন ব্যাক্তির সন্ধান পায়। ম্যারিনাস ছিল বিকৃত মস্তিষ্কের অধিকারী এবং একজন কমিউনিস্ট। বিভিন্ন বাড়িতে আগুন লাগিয়ে সে তীব্র সুখ পেত। ডাক্তারি ভাষায় এসব ব্যক্তিদের 'পাইরোম্যানিয়াক' বলে। সেদিন বারে বসে লুভ তার বন্ধুদের বলছিল যে সে রাইখস্টাগে আগুন লাগানোর প্ল্যান করছে। কয়েকজন S.A সদস্য তার পাশে বসা ছিল। তারা লুভের কথা শুনে তাকে ধরে নিয়ে আসে।
লুভের সন্ধান পাওয়ার কয়েক দিন আগে থেকেই নাৎসিরা কমিউনিস্টদের ফাঁদে ফেলানোর পায়তারা করছিল। রাইখস্টাগে আগুন ধরিয়ে দিয়ে কমিনিউস্টদের দায়ী করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আর ভাগ্যদেবীর কি আশ্চর্য কেরামতি!!! তিনি একজন কমিউনিস্টের বেশে লুভকে হাজির করেছিলেন, যে কিনা উল্টো নিজে থেকেই রাইখস্টাগে আগুন লাগানোর ব্যাপারে আগ্রহী। ফলে সমস্ত দোষ তার উপর তথা পুরো কমিউনিস্ট পার্টির উপর চাপানো যায়। এরকম অবিশ্বাস্য মিরাকল খুব কমই ঘটে। লুভকে পেয়ে নাৎসিরা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে যায়। তারা লুভকে রাইখস্টাগে আগুন লাগানোর ব্যাপারে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করতে থাকে।
রাখস্টাগে অগ্নিকান্ডের কয়েক মিনিটের মধ্যে পুলিশ লুভকে গ্রেপ্তার করে। তাকে অগ্নিকান্ডের জন্যে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। লুভকে অগ্নিকান্ডের জন্যে দায়ী করা হলেও, অগ্নিকান্ডের মূল ঘটনাটি ঘটিয়েছিল হিটলারের S.A বাহিনী। একজন মানুষের পক্ষে কোনভাবেই এত বড় একটা পার্লামেন্ট ভবনে আগুন লাগানো সম্ভব না। ঘটনাস্থলে লুভ আসার অনেক আগেই, S.A বাহিনী ভবনের অনেক স্থানে পেট্রল এবং অন্যান্য দাহ্য পদার্থ ঢেলে দিয়েছিল। লুভ ছিল এই ঘটনার বলির পাঁঠা মাত্র। এর আগে অনেকগুলো ছোটখাট বাড়িতে অগ্নিসংযোগের কারণে পুলিশ তাকে খুঁজছিলো। এই ঘটনার পরে তার শিরঃচ্ছেদ করা হয়।
(ছবিঃ- বিচারকার্য চলাকালীন লুভ)
রাইখস্টাগ অগ্নিকান্ডের পরপরই, হিটলার প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গকে দিয়ে একটি নতুন "ইমার্জেন্সি ডিক্রি" জারি করান। এতে নাৎসি সরকারকে যে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে, অশান্তি সৃষ্টিকারী যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পুরোপুরি নির্মূল করার অধিকার দেওয়া হয়। অতএব দেখা গেল যে, এক রাইখস্টাগ অগ্নিকান্ডের জোরে হিটলার শুধুমাত্র তার শত্রুদের নির্মূল করারই হাতিয়ার পাননি, বরঞ্চ কমিউনিস্ট অপশক্তির বিরুদ্ধে নাৎসিদের ত্রানকর্তা হিসেবে উপস্থান করে, অগণিত মানুষের সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হন।
রাইখস্টাগের এই অগ্নিকান্ড সম্পর্কে বিস্তারিত কখনোই জানা যাবে না। কেননা এই ঘটনার সাথে জড়িত অনেকেই পরবর্তিতে হিটলার কর্তৃক খুন হন। কিন্তু বলা হয়ে থাকে যে গোয়েবলস এবং গোয়েরিং ছিল এর মূল পরিকল্পনাকারী। ভ্যান ডার লুভ এসে ব্যাপারটিকে একদম সহজ করে দেয়। যদিও গোয়েবলস তার ডায়েরীতে এমনভাবে লিখেছেন যে তিনি কিছুই জানতেন না। কিন্তু তাকে মূল পরিকল্পনাকারীদের একজন হিসেবে সন্দেহ করা হয়। হিটলার এই ঘটনার সঙ্গে খুব একটা সম্পৃক্ত ছিলেন না। গোয়েরিং তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, শীঘ্রই তিনি তার প্রিয় ফুয়েরারের কাছে, কমিউনিস্টদের ধ্বংস করার জন্যে অকাট্য কারণ এনে উপস্থিত করবেন।
হিটলার ভেবেছিলেন, কমিউনিস্টদের শায়েস্তা করার কারণে তার ভোট সংখ্যা বাড়বে এবং এভাবে তিনি পার্লামেন্টে দুই তৃতীয়াংশ আসন লাভ করবেন। কিন্তু, এত কিছুর পরও তিনি ব্যর্থ হন। ১৯৩৩ সালের ৫ মার্চের নির্বাচনে হিটলার জয়ী হয়েছিলেন ঠিকই। ১কোটি ৭২ লাখ জার্মান তাকে সমর্থন প্রদান করেছিলেন। কিন্তু পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্যে তা যথেষ্ট ছিল না। যদিও এবার তিনি ৫০ লাখ ভোট বেশী পেয়েছিলেন কিন্তু এটি ছিল মোট ভোটারের ৪৪ ভাগ। এত প্রোপাগান্ডা চালানোর পরও অনেক জার্মান, নাৎসিদের এড়িয়ে গেছে!
যদিও বা নির্বাচনে হিটলার স্বীয় লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিলেন, কিন্তু এতে তিনি ভেঙ্গে পড়েননি। তিনি জানতেন যে সাফল্য আর বেশি দূরে নেই। রাইখস্টাগে আগুন ধরানোর ঘটনাটিও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। এর মাধ্যমে, জীবন সায়াহ্নে অবস্থানকারী প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ থেকে অন্তত একটি ডিক্রীতো পাস করানো গিয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের প্রতি হুমকিস্বরূপ যে কোনো ব্যাক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দলকে শায়েস্তা করা যাবে।
হিটলারের পরবর্তী পরিকল্পনা ছিল অতি সরল- "Ermächtigungsgesetz বা Enabling Act" কায়েম করা। সহজ কথায় বলতে গেলে, "Enabling Act" নামক বিশেষ ক্ষমতা যাকে দেওয়া হয়, তিনি চাইলে রাষ্ট্রের যে কোনো ধরণের আইন পরিবর্তন অথবা নতুন কোন আইন সংযোজন করতে পারবেন, চাইলে আইন পরিবর্তন করে তিনি একনায়কও হয়ে যেতে পারবেন। অর্থাৎ, রাষ্ট্র পরিচালনার পুরো দায়িত্ব আক্ষরিক অর্থে তার উপর বর্তাবে। তবে, এই আইন অনুযায়ী জার্মানির সমস্ত দায়দায়িত্ব হিটলারের উপর বর্তালেও, আইনের একটি বিশেষ অনুচ্ছেদে, জার্মানির প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বলবৎ রাখার কথা বলা হয়েছিল। হিটলার "Enabling Act" এর মাধ্যমে জার্মানির সকল ক্ষমতা নিজের কাছে কুক্ষিগত করতে সক্ষম হলেও, প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ চাইলেই সামরিক আইন জারি করে হিটলারের শাসনের অবসান ঘটাতে পারবেন। তাছাড়া, এরকম একটি আইন পাশ করতে হলে পার্লামেন্ট সদস্যদের দুই তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। অনেকে বলতে লাগলেন যে, জাতীয় নির্বাচনে হিটলার যেমন দুই তৃতীয়াংশ সীট পেতে ব্যর্থ হয়েছেন, তেমনি একটি মহা শক্তিশালী ও গণতন্ত্র হরণকারী আইন পাশের ক্ষেত্রেও তিনি একই ভাবে ব্যর্থ হবেন। সাংসদরা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।
কিন্তু হিটলারের এত কিছু ভাবার সময় ছিল না। তার নিজস্ব একটি পরিকল্পনা ছিল। তার বিশ্বাস এই পরিকল্পনা কাজে দেবে আর এটাই শেষ সুযোগ। হিটলার জানতেন যে, জার্মানরা গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি বিরক্ত ছিল। দেশে তখন প্রায় ৬০ লাখ মানুষ বেকার। অর্থনৈতিক মন্দা জার্মানদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। সেই সাথে ১ম বিশ্বযুদ্ধের ভার্সাই চুক্তির কারণে জার্মানদের সম্মান বলে আর কিছুই ছিল না। জার্মানরা মনে প্রাণে পুনঃজাগরণের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিল। তাদের দরকার ছিল একজন নেতার। ১৯৩৩ সালের ৫ মার্চের নির্বাচনে ১ কোটি ৭২ লাখ জার্মান হিটলারের উপর আস্থা প্রদান করেছিলেন। হিটলার এবার বাকি সব জার্মান জনগণের আস্থা অর্জনের পরিকল্পনা করেন।
(ছবিঃ- গ্যারিসন চার্চে বক্তৃতারত হিটলার, তাঁর সামনে বসে প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ)
১৯৩৩ সালের ২১ মার্চ, হিটলার ক্ষমতা লাভের জন্যে তার শেষ চাল চালেন। এই দিন জার্মানির পটস্ডাম শহরের গ্যারিসন চার্চে নতুন পার্লামেন্ট তথা রাইখস্টাগের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গসহ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অসংখ্য জার্মান বীরদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। একজন উৎফুল্ল ও বিনয়ী হিটলার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সমস্ত অতিথিদের বরণ করে নেন। এই অনুষ্ঠানে বক্তৃতাদানকালে হিটলার বলেন,
"গত কয়েকটি সপ্তাহ ছিল জার্মান জাতির জন্যে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা যথাযথরূপে আমাদের জাতীয় সম্মান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছি। ধন্যবাদ জেনারেল ফিল্ডমার্শাল হিন্ডেনবার্গ। আজ সমগ্র জার্মানি জুড়ে পুরাতন ও নতুন শক্তির মাঝে এ শুভ মিলন উদযাপন করা হবে। আমরা আপনাকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই। দেশের জন্যে আপনার অবদান ভুলার নয় হের প্রেসিডেন্ট। আজ আপনার অবস্থান আমাদের সবার উপরে।"

(ছবিঃ- প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গকে অভিবাদন দিচ্ছেন হিটলার)
এরপর হিটলার বক্তৃতা মঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আবেগাক্রান্ত হিন্ডেনবার্গের কাছে যান এবং তার হাতটি ধরেন এবং সম্মানের সাথে কুর্নিশ করেন। নাৎসি প্রোপাগান্ডা চীফ গোয়েবলস অনুষ্ঠানটি সারা বিশ্বে সম্প্রচারের ব্যবস্থা করেছিলেন। সমগ্র বিশ্ব হিটলারের সাথে হিন্ডেনবার্গ তথা পুরো জার্মান অভিজাত শ্রেণীর এই মিলন প্রত্যক্ষ করেন। পটস্ডামের এই অনুষ্ঠানটি পুরোপুরি সফল ছিল। চোখ ধাঁধানো এই অনুষ্ঠানে, হিটলার, প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গসহ জার্মানির অভিজাত শ্রেণী এবং সেই সাথে জার্মান সেনাবাহিনীর সকলেরই মন জয় করতে সক্ষম হন। কোটি কোটি জার্মান হিটলারের সাথে হিন্ডেনবার্গের এই আবেগঘন মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করেছিলেন। জার্মানরা তাদের প্রিয় ফিল্ডমার্শাল হিন্ডেনবার্গকে ভালোবাসতেন। আর এর প্রভাব নিশ্চিতভাবে নাৎসিদের পক্ষেই পড়েছিল। চারপাশে জোর গুঞ্জন উঠছিল যে কিছু একটা ঘটতে চলেছে যার ফলে জার্মানির ভাগ্য হয়তো পুরো পাল্টে যাবে।
(ছবিঃ- রাইখস্টাগের অধিবেশনে হিটলার 'Enabling Act' পাশ করানোর প্রস্তাব পেশ করছেন)
দুই দিন পর ১৯৩৩ সালের ২৩শে মার্চ পুরো জার্মান জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল। এই দিন বার্লিনের ক্রোল অপেরাহাউসে রাইখস্টাগের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনের শুরুতেই হিটলারকে "Enabling Act" প্রদানের প্রস্তাব পেশ করা হয়। এই আইনকে অবশ্য সরাসরি "Enabling act" হিসেবে নামকরণ করা হয়নি। Gesetz zur Behebung der Not von Volk und Reich বা "রাইখ ও রাইখের মানুষের দুর্দশা দূরীকরনের আইন" এই নামে নামকরণ করা হয়। কিন্তু ভোট গ্রহণের আগেই জার্মানির "সোশিয়াল ডেমোক্র্যাট" দলের নেতা প্রতিবাদ করে উঠেন। তিনি সাহসী কন্ঠে বলে উঠেন,
"এই ঐতিহাসিক মুহুর্তে আমরা জার্মান সোশিয়াল ডেমোক্রেটগণ, নিজেদেরকে মানবতা, মুক্তি , ন্যায়বিচার এবং সমাজতন্ত্রের জন্যে সঁপে দিচ্ছি। কোনো "Enabling Act"-ই আমাদের চিন্তাধারা এবং আদর্শকে ধ্বংস করতে পারবে না। কেননা এগুলো চিরস্থায়ী, অবিনশ্বর।"
এর জবাবে রাগান্বিত হিটলার বজ্রকন্ঠে বলে ওঠেন,
"শেষ পর্যন্ত তোমরা এসেছ! কিন্তু হায় বড় দেড়ি করে ফেলেছ তোমরা। জার্মানির কাছে তোমাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে। তোমাদের কোনো দরকার নেই। তোমাদের বিদায় ঘন্টা বাজছে। কোনো দরকার নেই তোমাদের ভোটের। জার্মানি মুক্তি লাভ করবে, কিন্তু তোমাদের মাধ্যমে নয়।"
হিটলার কথা শেষ করার সাথে সাথে, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে, ভবনের বাহির থেকে হিটলারকে ক্ষমতা প্রদানের জন্যে অগণিত S.A সৈন্য চিৎকার করে উঠে, "Full power or else....." "Full power or else....." আইন অনুযায়ী হিটলারকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা, বৈদেশিক রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি করার ক্ষমতা, সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা দেওয়া হবে। আইনটি হিটলারের উপর চার বছরের জন্যে বহাল থাকবে।
বাইরে S.A. সৈন্যদের গগনবিদারী শ্লোগানের মাঝেই রাইখস্টাগে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। দেখা গেল যে, হিটলারকে "Enabling Act" প্রদানের পক্ষে ভোট পড়েছে ৪৪১টি, অপর দিকে বিপক্ষে ভোট পড়েছে ৮২টি(সবগুলো সোশিয়াল ডেমোক্রেটদের ভোট)। কিন্তু এতে কিছু যায় আসে না। পার্লামেন্টের দুই তৃতীয়াংশ সদস্য "Enabling Act" এর পক্ষে ভোট দিয়ে ফেলেছেন। তারা স্পষ্টতই হিটলারকে সর্বাধিনায়করূপে দেখতে চান। সমগ্র পার্লামেন্ট এবং পার্লামেন্টের বাহিরে নাৎসিদের উল্লাসধ্বনিতে রাইখস্টাগের কার্যক্রম কিছুক্ষণের জন্যে থেমে যায়। উল্লাসধ্বনি থেমে যাবার পর আবার যখন কার্যক্রম শুরু হয়, তখন কিন্তু জার্মানি আর আগের জার্মানি নেই, সেই জার্মানি ছিল হিটলারের একান্ত নিজের। কঠোর সাধনা করেই তিনি তা পেয়েছিলেন। এবং আশ্চর্য বিষয় হল এই যে, তিনি তা অর্জন করেছিলেন বৈধ পদ্ধতিতে এবং দেশের অধিকাংশ জনগণের সমর্থনপুস্ট হয়ে। আর এভাবেই ১৯৩৩ সালের ২৩ মার্চ, হিটলারের হাতে জার্মানির ভাগ্য সঁপে দেওয়া হয়।
এরপর হিটলার বিদ্যুৎ গতিতে তার শত্রু নিধন করা শুরু করেন। তাকে আটকানোর সাধ্য কারো ছিল না। হিটলার "Enabling Act" লাভ করেছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাংসদদের ভোটে। এই কারণে তিনি ভোট গ্রহণের আগে এসব রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আশ্বাস প্রদান করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে "Enabling Act" লাভের পর, তিনি তাদের ধ্বংস করার কাজে হাত দেন। শত্রু নিধনের পরিকল্পনা হিসেবে একের পর এক রাজনৈতিক দলকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। তাও খুব অল্প সময়ের মধ্যে। যেখানে যে অবস্থায় পাওয়া যায়, সেই অবস্থাতেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের ঠাই হয় কারাগারে নতুবা নব্য নির্মিত কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে। এই ধরপাকড় অবস্থা কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে। এরপর দেখা গেল যে, এক ন্যাশনাল সোশালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি(নাৎসি পার্টি) বাদে জার্মানিতে আর কোনো রাজনৈতিক দল নেই। তখন ফুয়েরারের পক্ষ থেকে নতুন আইন জারি করা হয়-
"ন্যাশনাল সোশিয়ালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি(নাৎসি পার্টি)ই হল জার্মানির একমাত্র বৈধ রাজনৈতিক দল। কোনো ধরণের রাজনৈতিক দল গঠন এবং রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হবে।.............. আজ থেকে গোটা জার্মানি ন্যাশনাল সোশালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি(নাৎসি পার্টি)কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে.........."
এই নতুন আইন জারির মাধ্যমে হিটলার জার্মানির প্রায় সর্বেসর্বা বনে যান। কিন্তু, এর সাথেই হিটলারের সামনে আবার এক সঙ্কটজনক পরিস্থিতি আসে। ১৯৩৩ সালে চ্যান্সেলর হবার পর থেকেই, S.A বাহিনীর প্রধান এবং সেই সাথে হিটলারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর্নস্ট রোম S.A কে জার্মান সেনাবাহিনীর স্থলাভিষিক্ত করার জন্যে হিটলারের কাছে জোড়াজুড়ি করতে থাকেন। ফরাসি বীর নাপোলিয়ঁ রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পর তার নিজ বাহিনীকে মূল সেনাবাহিনীর স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন। রোমেরও একই স্বপ্ন ছিল।
রোমের প্রস্তাবটি অযৌক্তিক ছিল না। ১৯৩৩ সালে, S.A এর সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ লাখ। পক্ষান্তরে সেনাবাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল এক লাখ। ভার্সাই চুক্তির কোপানলে পড়ে তৎকালীন সময়ে জার্মান সেনাবাহিনী কার্যত পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রোম ভুলে গিয়েছিলেন যে, সেনাবাহিনী আকারে খর্বাকৃতির হলেও, মানুষের হৃদয়ে তাদের স্থান ছিল অনেক উঁচুতে। ১৯১৮ সালে, ১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের সময়, সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়িয়ে, পুরো জার্মানি পরাজয়ের দুঃখে কেঁদেছিল। সেনাবাহিনীকে স্থলাভিষিক্ত করতে গেলে যে একটি গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাবে, এই বাস্তবতাটিকে রোহ্ম খুব একটা আমলে নিতে চাননি। অন্যদিকে, হিটলারেরও হাত বাঁধা ছিল। S.A. কে নিয়ে যখন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল, তখন প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ হিটলারকে তলব করেন। তিনি হিটলারকে সাফ জানিয়ে দেন যে, হিটলারের কারণে সেনাবাহিনীর কিছু হলে তিনি মার্শাল ল জারি করে দেবেন। এতে হিটলারের শাসনের অবসান ঘটবে।
এরকম পরিস্থিতিতে, রোমের আচরণও সন্দেহজনক হয়ে উঠতে থাকে। ১৯৩৪ সালের শুরু থেকে হিটলারের প্রতি রোমের আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। আগের সেই আনুগত্যমূলক ব্যবহারের লেশ মাত্রও নেই! (আসলে রোমও বুঝতে পেরেছিলেন যে তার বাহিনী সকলের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, এই কারণে নিজের অস্তিত্ব বাচিয়ে রাখার জন্যে তিনি এমনটি করছিলেন। ধীরেধীরে হিটলারের কাছে ভুঁয়ো খবর আসতে থাকে যে, রোম তার বাহিনী নিয়ে হয়তো যেকোনো সময় বিদ্রোহ করতে পারেন।
এইবার হিটলার বুঝতে পারলেন যে তিনি উভয় সংকটে পড়ে গিয়েছেন। শীঘ্রই কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা না নিলে তাকে সব কিছু হারাতে হতে পারে। তার কাছে দুটি পথ খোলা আছে, হয় রোমের পক্ষ নিয়ে তার S.A. বাহিনীকে সেনাবাহিনীর স্থলাভিষিক্ত করা(এতে গৃহযুদ্ধ অবধারিত। সেই সাথে তার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা একদম নিশ্চিত), নয়তো রোম এবং তার S.A বাহিনীকে ধ্বংস করে ফেলা। শেষেরটি করলে সেনাবাহিনীর প্রশ্নাতীত আনুগত্য অবধারিতভাবে পাওয়া যাবে এবং হিটলার যদি কোনো যুদ্ধ বাঁধিয়ে ফেলেন(৫ বছর পরেই তিনি তা বাঁধাবেন) তবে সেনাবাহিনী হাসিমুখে তার জন্যে যুদ্ধ করবে। আর তাছাড়া ১৯৩৪ সালে S.A বাহিনীর প্রয়োজন ফুঁরিয়ে গিয়েছিল। জার্মানিতে নাৎসি পার্টি বাদে কোনো রাজনৈতিক দলের অস্তিত্বটুকুও ছিল না। এমতাবস্থায় রাস্তায় রাস্তায় S.A. বাহিনী কাদের সাথে লড়াই করবে? এই পর্যায়ে এসে হিটলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন— নিজেকে এবং সেই সাথে নিজের স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে, S.A. কে ধ্বংস করতে হবে। অতঃপর, ১৯৩৪ সালের ৩০শে জুন সকাল বেলা, অপারেশন হামিংবার্ড(Unternehmen Kolibri) আরম্ভ করবার মাধ্যমে S.A. এর উপর হিটলার তাঁর নিষ্ঠুর ধ্বংসযজ্ঞ চালান।
আর্নস্ট রোম সহ S.A এর শীর্ষস্থানীয় সকল নেতাকে হত্যা করা হয়। টানা দুই দিন ধরে হত্যাযজ্ঞ চলে। অবশেষে ২ জুলাই অপারেশন হামিংবার্ডের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। নাৎসিদের পক্ষ থেকে ৮২জন মৃতের সংখ্যা ঘোষণা করা হয়। এদের মধ্যে আবার অনেকেই ছিলেন S.A এর সাথে যাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। কেবলমাত্র হিটলারের সাথে শত্রুতার জোড়েই তাদের হত্যা করা হয়।(১৯৪৫ সালে যুদ্ধের পর ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালে অনেক নাৎসি বিরোধী ব্যক্তিগণ এই সংখ্যাটি আরও বেশী হবে বলে দাবী করেন। কিন্তু প্রকৃত মৃতের সংখ্যা কোনোদিনও জানা যাবে না। কেননা নাৎসিরা অপারেশন হামিংবার্ড সম্পর্কিত সমস্ত নথি যুদ্ধের শেষ দিকে ধ্বংস করে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল।)
সেদিন S.S. ও গেস্টাপোবাহিনীর তান্ডবে হিটলারের অনেক পুরোনো এবং নতুন শত্রু নিহত হয়। শুধু তাই নয়, নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করার জন্যে গোয়েরিং এবং হিমলার নিজেদের অনেক শত্রুকেও এই অপারেশনের আওতায় হত্যা করেন। অপারেশন হামিংবার্ডের কারণে সেদিন যারা নিহত বা আহত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজনের কথা না বললেই নয়-
গ্রেগর স্ট্রাসার- নাৎসিদের এককালীন সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। তিনি এককালে হিটলারের প্রিয় পাত্র ছিলেন। কিন্তু স্ট্রাসার ছিলেন কমিউনিস্ট ঘরানার। যার কারণে হিটলারের সাথে তার মতবিরোধ লেগেই থাকতো। গুনের বিচারে স্ট্রাসার হিটলারের সমকক্ষ ছিলেন। অনেকে হিটলারের পরিবর্তে তাকে নাৎসিদের নেতা হিসেবে দেখতে চাইতেন। মতের মিল না হওয়াতে, ১৯৩২ সালে, হিটলার স্ট্রাসারকে বহিস্কার করেন। অপারেশনের দিন স্ট্রাসারকে গেস্টাপোরা ধরে নিয়ে যায়। তার পিঠে গুলি করা হয়। এতে তিনি মারা না গেলেও মারাত্মক আহত হন। তার রাজনৈতিক জীবনের সেখানেই ইতি ঘটে।
কার্ট ভন স্লাইশার- হিটলারের আগে জার্মানির চ্যান্সেলর ছিলেন তিনি। চ্যান্সেলর-কাম-একনায়ক হিসেবে শাসন করার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও হিটলার তাকে বৈধভাবে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন। একারণে তিনি আজীবন হিটলার এবং নাৎসিদেরকে ঘৃণা করতেন। তার মাশুল তিনি দিয়েছিলেন অপারেশনের দিন S.S দের হাতে। S.S সৈন্যরা তার বাড়িতে তাকে হত্যা করে। তার স্ত্রীকে প্রথমে রেহাই দেওয়া হলেও তিনি বেশী বাড়াবাড়ি করছিলেন। যার কারণে তাকেও পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
গুস্তাভ ভন কাহ্র- তার সাথে নাৎসিদের পুরোনো শত্রুতা ছিল। ১৯২৩ সালের বীয়ার হল বিদ্রোহের সময় তিনি একক প্রচেষ্টায় হিটলারের সামরিক কায়দায় ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা ধ্বংস করে দেন। গোয়েরিং তার কথা ভুলে যাননি। অপারেশনের দিন ঠিকই শোধ নেওয়া হয়।
কার্ল আর্ন্স্ট- বার্লিনের S.A এর প্রধান। অপারেশনের দিন তিনি বার্লিনে ছিলেন না। সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে মধুচন্দ্রিমায় ছিলেন। তাকে হত্যা করা হয়।
ফ্রাঞ্জ ভন পাপেন- S.S এর মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্টে ছিলেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন জার্মান ভাইস চ্যান্সেলর। কিন্তু তিনি অন্য দলের ছিলেন বিধায়(নাৎসিরা জোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে) তাকেও হত্যার জন্যে তালিকাকৃত করা হয়। অবশ্য অপারেশনের ভয়াবহতার কথা আঁচ করতে পেরে এর আগের দিনই তিনি জার্মানি ছেড়ে পালিয়ে যান।
অপারেশন হামিংবার্ড S.A কে পুরোপুরি পঙ্গু করে দিয়েছিল। হাইনরিখ হিমলার কর্তৃক পরিচালিত S.S বাহিনীকে S.A. থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। অপারেশনের আগে S.A এর সৈন্য সংখ্যা ছিল ২০ লাখ। অপারেশনের পর এই আকার অনেকাংশে কমিয়ে ফেলা হয়। S.A সৈন্যদেরকে জার্মান সেনাবাহিনীর অন্তর্ভূক্ত করা হয়। অপারেশনের পর থেকে যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত S.A তার পূর্ববর্তী কার্যকলাপের ছায়া হয়ে বিরাজ করতে থাকে। যুদ্ধের শেষের দিকে উপায়ন্তর না দেখে S.A এর সৈন্যদেরকে নিয়ে জোড়াতালি দিয়ে একটি প্যানজার ডিভিশন গঠন করা হয়। যুদ্ধ শেষে নাৎসিদের সাথে S.A এরও পতন ঘটে।
অপারেশন হামিংবার্ডের সাফল্যে হিটলার হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। তার মানসিক অবস্থারও বেশ উন্নতি হয়। ভাগ্যও তাকে সাহায্য করা শুরু করে। উল্লেখ্য, ১৯৩৪ সালের প্রথম ছয় মাস বেশ দুশ্চিন্তার মধ্যে কাটলেও, শেষ ছয় মাস ধরে ভাগ্য দেবী তাকে দু হাত ভরে সবকিছু দিতে থাকে। অপারেশন হামিংবার্ডের এক মাস পর হিটলারের কাছে দুঃসংবাদের মোড়কে একটি সুসংবাদ আসে। ২রা অগস্ট প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ মৃত্যুবরণ করেন। আপাত দৃষ্টিতে সকলের কাছে এটি দুঃসংবাদ হলেও হিটলারের কাছে এটিই ছিল সুসংবাদ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই মুহুর্তের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করার আগে এই বিষয়ে কিছু বলে নেওয়া জরুরি।
১৯৩৩ সালে হিটলারের জোড়াজুড়িতে "Enabling Act" আইনটি চালু করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে হিটলার অসামান্য ক্ষমতা লাভ করেন। কিন্তু এই আইনের আওতায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বলবৎ রাখা হয়। এটি একটি মারাত্মক ভুল ছিল। যেদিন প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ হিটলারকে তলব করে মার্শাল ল জারি করার হুমকি দেন সেদিনই হিটলার প্রথম বুঝতে পারেন যে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বলবৎ রাখাটা কত বড় একটি ভুল ছিল। এই ঘটনার পর থেকেই হিটলার প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছিলেন। তার একটি মাত্রই উদ্দেশ্য ছিল, তা হল প্রেসিডেন্টের পদটি নিজের জন্যে করায়ত্ত করা(প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নিজের করে নেওয়ার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও হিটলার প্রেসিডেন্ট পদটি আর রাখতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন তার আনুষ্ঠানিক পদবী হোক "দ্য ফুয়েরার"। নাৎসিরা তাকে ফুয়েরার বলে ডাকলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তার পদবী ছিল চ্যান্সেলর।) কিন্তু, অন্যদিকে হিটলারের মতবিরোধী লোকের সংখ্যাও কম ছিল না। তাদের মধ্যে অনেকেই জার্মান রাজবংশের পুনঃজাগরণে বিশ্বাস করতেন। হিন্ডেনবার্গের মৃত্যুর পর রাজবংশেরই কোনো সদস্য প্রেসিডেন্টের পদটি অধিগ্রহণ করুক, এমনটা তারা চাইতেন। হিটলারের ভাইস চ্যান্সেলর ফ্রাঞ্জ ভন পাপেন ছিলেন এই দলেরই অন্তর্ভুক্ত। অপারেশন হামিংবার্ড আরম্ভ হবার কয়েকদিন আগে পাপেন প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গের সাথে দেখা করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ তাকে অন্ধের মত বিশ্বাস করতেন। তিনি হিটলারের ক্রমাগত ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ব্যাপারটি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং এই কারণে তিনি পাপেনকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনার জন্যে অনুরোধ করেন। পাপেন অবশ্য হিন্ডেনবার্গের অনুরোধ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বরং, নিজ জীবন বাঁচাতে অপারেশন হামিংবার্ডের দিন তাকে জার্মানি ছেড়ে পালাতে হয়েছিল।
১৯৩৪ সালের ২রা অগাস্ট, সকাল ৯টায়, প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি তার উইল তৈরি করে পাপেনের কাছে রেখে গিয়েছিলেন। হিন্ডেনবার্গ উইলের মধ্যে রাজবংশের পুনরুত্থানের ব্যাপারে কোনো আদেশ দেননি। এটি পাপেনকে বেশ অবাক করেছিল। প্রেসিডেন্ট পাপেনকে একটি চিঠিও দেন। চিঠিটি হিটলারের জন্যে ছিল। তিনি পাপেনকে মৃত্যুর পর চিঠিটি হিটলারের কাছে পৌছে দেওয়ার জন্যে অনুরোধ করেন। তিনি পাপেনকে এও বলেন যে চিঠিটিতে তিনি হিটলারকে তার মৃত্যুর পর রাজবংশের হাতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্যে অনুরোধ(কেবল অনুরোধ, কোনো আদেশ নয়) করেছেন।
১৯৩৪ সালের ২রা অগাস্ট, প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর কয়েক ঘন্টার মধ্যে হিটলার তার "Enabling Act" আইনের ক্ষমতাবলে একটি নতুন আইন জারি করে বসেন-
The Reich Government has enacted the following law which is, hereby, promugated.Section 1: The office of Reich President will be combined with that of Reich Chancellor. The existing authority of the Reich President will consequently be transferred to the Fuhrer and Reich Chancellor, Adolf Hitler. He will select his deputy.Section 2: This law is effective as of the time of the death of Reich President von Hindenburg.
এই আইনের প্রথম অংশে, প্রেসিডেন্টের সকল ক্ষমতা চ্যান্সেলর অ্যাডলফ হিটলারের কাছে হস্তগত করার কথা বলা হয়। সেই সাথে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এবং চ্যান্সেলরের কার্যালয়কে একীভূত করার কথাও এখানে বলা হয়। দ্বিতীয় অংশটিতে বলা হয় যে, প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর সময়কাল থেকে এই আইনটি কার্যকর করা হয়েছে।
হিটলার যে আইনটি প্রণয়ন করেছিলেন তা কিন্তু এক দিক দিয়ে বেআইনি ছিল। "Enabling Act" আইনানুযায়ী, হিটলার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। কিন্তু প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর পর চতুর হিটলার ঠিকই প্রেসিডেন্টের কার্যালয়কে তার কার্যালয়ের সাথে একীভূত করে ফেলেন। আশ্চর্যের বিষয় হল, কেউ এই ঘটনার প্রতিবাদ করেনি। সবাই যেন মেনে নিয়েছে যে, হিটলারের কথাই আইন। হিটলারের কেরামতি কিন্তু এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। একই দিনে তিনি আরেক অবিশ্বাস্য কান্ড করে বসেন। হিটলারের আদেশে জার্মান সেনাবাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকে, জেনারেল ফিল্ড মার্শাল থেকে শুরু করে সাধারণ সৈনিক পর্যন্ত, একটি আনুগত্যের শপথ নিতে হয়।
"ঈশ্বরকে সাক্ষী রেখে আমি শপথ করছি যে, জার্মান রাইখের এবং জনগণের ফুয়েরার, সেনাবাহিনীর সুপ্রীম কমান্ডার, অ্যাডলফ হিটলারের প্রতি, আমি আমার শর্তহীন আনুগত্য প্রকাশ করব। একজন নির্ভীক সৈনিক হিসেবে, এই শপথ রক্ষা করার জন্যে, নিজের জীবন বিপন্ন করতে, আমি দ্বিধাবোধ করব না।"
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, এই শপথবাক্য পাঠ করা হয়েছে অ্যাডলফ হিটলারকে উদ্দেশ্য করে, জার্মানিকে নয়(পূর্বের সকল প্রকারের সামরিক শপথ মাতৃভূমি এবং জার্মান সংবিধানকে উদ্দেশ্য করা নেওয়া হত।) এই শপথ নেওয়ার মাধ্যমে সেনাবাহিনীর প্রতিটি সৈনিক হিটলারের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে পড়েন। এরপর থেকে হিটলারের প্রতি শর্থহীন আনুগত্য প্রদান করা প্রতিটি জার্মান সৈনিকের জন্যে একটি পবিত্র দায়িত্ব হয়ে পড়ে। হিটলার অপারেশন হামিংবার্ড সংঘটিত করে সেনাবাহিনীকে ভাবী বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। শর্তহীন আনুগত্য প্রকাশ করা ছিল সেনাবাহিনীর তরফ থেকে হিটলারের জন্যে একটি বিশেষ উপহার।
১৯৩৪ সালের ৭ অগাস্ট, প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। সেখানে ডিফেন্স মিনিস্টার জেনারেল ফিল্ডমার্শাল ভার্নার ভন ব্লমবার্গ(Werner von Blomberg) হিটলারকে "মাইন ফুয়েরার(আমার নেতা)" বলে সম্বোধন করেন। তিনি এও প্রস্তাব করেন যে আজ থেকে "হাইল হিটলার"এর পরিবর্তে হিটলারকে "মাইন ফুয়েরার" বলে সম্বোধন করা হোক। পরবর্তীতে এটিই হিটলারকে সম্বোধন করার আনুষ্ঠানিক রীতিতে পরিণত হয়।
(ছবিঃ- হিন্ডেনবার্গের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান)
প্রেসিডেন্টের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের পর, নাৎসি সরকার হিটলারের নতুন ক্ষমতাকে একটি বৈধতা প্রদানের জন্যে পুরো জার্মানি জুড়ে একটি গণভোটের ব্যবস্থা করে। কিন্তু এরই মাঝে হিটলার পাপেনের কাছ থেকে প্রেসিডেন্টের শেষ উইল, টেস্টামেন্ট এবং চিঠি পান। চিঠিটি পড়ে হিটলার বিপাকে পড়ে যান। চিঠিটিতে রাজবংশ থেকে প্রেসিডেন্ট বাছাই করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু হিটলার এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট পদটিকে বাতিল করে তার কার্যালয়কে নিজের সাথে একীভূত করে ফেলেছেন। এই চিঠির কথা প্রকাশ পেলে বিপদ হতে পারে এই ভেবে হিটলার ততখানত চিঠিটি পুড়িয়ে ফেলেন(যুদ্ধের পর ন্যুরেমবার্গ- এর বিচারকার্যের সময় পাপেনের কাছ থেকে প্রথমবারের মত হিন্ডেনবার্গের চিঠির কথা জানতে পারে বাইরের বিশ্ব)। কিন্তু হিটলার ঠিকই প্রেসিডেন্টের উইল এবং টেস্টামেন্ট প্রকাশ করেন। তাও গণভোটে বেশী ভোট পাওয়ার জন্যে, কাটছাঁট করে এটি প্রকাশ করা হয়। ১৯৩৪ সালের ১৯শে অগাস্ট, গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। হিটলার যে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হবেন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। ৩ কোটি ৮০ লাখ জার্মান(মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ) "হ্যাঁ" ভোট প্রদানের মাধ্যমে হিটলারের প্রেসিডেন্ট পদ অধিগ্রহণের পক্ষে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানায়। তারা মেনে নেয় যে, প্রেসিডেন্ট এবং চ্যান্সেলর, উভয়েরই ক্ষমতা এক হিটলারের উপরে বর্তাবে। তিনি হবেন জার্মানির ফুয়েরার। ২০শে অগাস্ট, জার্মানির সকল সরকারী বেসরকারি কর্মচারীকে বাধ্যতামূলক শপথ নিতে হয়।
"আমি শপথ করছি যে, আমি জার্মানির ফুয়েরার,অ্যাডলফ হিটলারের প্রতি আনুগত থাকবো এবং তাকে মান্য করব। আমি জার্মান সংবিধান অনুযায়ী সকল আইন মান্য করব এবং সুনাগরিক হিসেবে নিজের কর্তব্যগুলো যথাযথভাবে পালন করব। ঈশ্বর আমার সহায় হন।"
অবশেষে, দীর্ঘ চৌদ্দ বছর সংগ্রামের পর হিটলার জার্মানির একনায়ক তথা ফুয়েরারে পরিণত হন ও তাঁর স্বপ্নের 'টোটাল পাওয়ার" কায়েম করতে সক্ষম হন।
The Rise and Fall of the Third Reich- William L. Shirer
Mein Kampf- Adolf Hitler
The Coming of the Third Reich- Richard J. Evans
The Third Reich: A History of Nazi Germany- Thomas Childers
No comments:
Post a Comment