আপনার প্রশ্নের ছোট্ট উত্তর হয় - না।
ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে 'দারিয়া' বলে এক মরুদ্যানে একটি পরিবার খেজুরের বাগান করে। এই বাগানকে ঘিরে ক্রমে গড়ে ওঠে একটি শহর, আর অষ্টাদশ শতকে এই পরিবারের প্রধান সৌদ ইবন মুহাম্মদ ইবন মুকরিনকে শহরের শাসক বলে মেনে নেয়। তাঁকেই সাধারণত সৌদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ধরা হয়। সৌদ পরিবার প্রকৃত পক্ষে বানু হানিফার অন্তর্গত, যারা ইসলামের প্রথম যুগে হযরত মুহাম্মদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত ছিল ও পরে ইসলাম গ্রহণ করে। বলা বাহুল্য, এঁদের সাথে নবীর কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। আপনার মূল প্রশ্নের উত্তর এখানেই শেষ।
কিন্তু এর পরেও একটা কাহিনী আছে। সৌদি রাজবংশের ধমনীতে হযরত মুহম্মদের রক্ত প্রবাহিত না হলেও নবীর সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক আছে, এমন পরিবারকে তাঁরা আরব থেকে উৎখাত করেছিলেন এবং এর ফলস্বরূপ আরবের ইতিহাস, ইসলামের ইতিহাস ও তার সাথে বিশ্বের ইতিহাসে এক গভীর প্রভাব পড়ে যার কম্পন আমরা এখনও অনুভব করি। আমার মনে হয় এই কাহিনীটি বিশেষ চিত্তাকর্ষক, তাই এই সুযোগে একবার লিখে ফেলা যাক। অতি লম্বা কাহিনী আর মূল প্রশ্নের উত্তরের সাথে এর সম্পর্ক অতি ক্ষীণ। অতএব যারা লম্বা লেখা পড়তে আগ্রহী নন, এইখানেই এই উত্তরের ইতি।
উমায়েদ আর আব্বাসিদ খলিফাদের সময়ের কথা। ইসলামিক জগতে মুতাজিলা নামক একধরণের দার্শনিকদের অসাধারণ প্রভাব ছিল। এই দার্শনিকরা মনে করতেন যুক্তি বোধ আল্লাহ-এর দান, অন্ধ ভাবে কোনো কিছু বিশ্বাস করা আসলে আল্লাহের অবমাননা। আরও উল্লেখ্য তাঁরা এও বিশ্বাস করতেন কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ - এ সবসময় হাদিস দিয়ে নির্ধারিত হয় না, ধর্মগ্রন্থ ব্যাখ্যা করে হয় না, হয় যুক্তি দিয়ে। 'আল্লাহ তালা ধড়ের উপর মাথা দিয়েছেন, আর মনে যুক্তি দিয়েছেন, অন্ধ অনুসরণ করো না, তাহলে সেটা তাঁর সৃষ্টিরই অবমাননা। তিনি যদি এই চাইতেন মানুষ অন্ধ অনুসরণ করুক, যুক্তিবোধ তিনি দান করেছেন কেন ?'-এই ছিল তাঁদের মূল কথা। মুতাজিলাদের সাংঘাতিক শত্রু ছিলেন উলেমারা। তাঁদের সাথে দফায় দফায় বিতর্ক সভায় সংঘাত হত তাঁদের। কিন্তু মোটের উপর খলিফারা মুতাজিলাদের পক্ষেই ছিলন। খলিফা হারুন-আল-রশিদের সময়ে তাঁদের প্রভাব শিখর স্পর্শ করে। বাগদাদের 'বাইতুল আল হিকমাহ' (জ্ঞানের গৃহ)-তে এমন কোনো ধর্ম ছিল না যার ধর্মগ্রন্থ নেই। এখানকার পন্ডিতরা সুদূর নালন্দা অবধি যাত্রা করতেন একদিকে আরেকদিকে কন্সটান্টিনোপল, কয়েকজন তো বইয়ের সন্ধানে চিনের চাংআন অবধি ধেয়ে গিয়েছিলেন। গণিত, দর্শন, ভূগোল, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন, ইতিহাস (আমরা যারা ইতিহাসের ছাত্র, হিস্টোরিওগ্রাফি বা ইতিহাস চর্চার ব্যকরণ শেখার সময় আজও আমাদের ইবন খালদুনের কাজ পড়তে হয়) এমন কোনো বিষয় ছিল না - যাতে আরবরা তখন এগিয়ে ছিল না। ধর্মান্ধ ইউরোপ যখন প্লেটো, অ্যারিস্টটলকে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে - যুক্তিকে ত্যাগ করে জোন অফ আর্ককে ডাইনি বলে ক্রসে পোড়াচ্ছে - মুতাজিলারা পরম মমতায় প্লেটো অধ্যয়ন করছেন, অ্যারিস্টটলকে রক্ষা করছেন বাগদাদে। এতটাই পরমত সহিষ্ণু ছিল তখনকার বাগদাদ ও আরব জগৎ বিখ্যাত আরব অন্ধ কবি আল-মা'আরি যিনি ছিলেন ঘোষিত যুক্তিবাদী, মুক্ত চিন্তক ও নাস্তিক, তাকে সাদরে সম্মান জানানো হয়েছিল খলিফার তরফ থেকে। বলা বাহুল্য উলেমারা এসব দেখে গেলেন এবং এ অনাচারের এ পাপের শাস্তি আল্লাহ একসময় দেবেন এই সঙ্কল্প তাঁদের মনে দৃঢ় হল। কিন্তু আপাতত তাঁদের কিছু করার ছিল না।

বাইতুল আল হিকমাহ
তাঁদের আশা পূর্ণ হল ত্রয়োদশ শতকের মাঝামাঝি। পঙ্গপালের মতো চেঙ্গিজ খানের মোঙ্গল সেনার বন্যায় প্রথমে পতন হল মুক্তচিন্তার অন্যতম কেন্দ্র, খরেজম সাম্রাজ্যের আর তার মুক্ত - সমরখন্দের। কবিরা হাহুতাশ করে গাইলেন - 'কোথায় আমাদের কোলাহল মুখর সমরখন্দ !'। মোঙ্গল বন্যা কিন্তু এখানেই থামল না, সিন্ধুর তীরে তাঁদের দিল্লিশ্বর গিয়াসুদ্দিন বলবন আটকালেন বটে, কিন্তু সেই জয় এল তার প্রিয় পুত্রের রক্তমূল্যে। বন্যা ধেয়ে গেল বাগদাদের দিকেও। পতন হল শহরের। হুলাগু খান কথা দিয়েছিলেন, বাগদাদ আত্মসমর্পন না করলে এই শহরকে তিনি মুছে দেবেন। কথা রাখলেন তিনি। সমস্ত গ্রন্থাগারে আগুন লাগানো হল। 'বাইতুল আল হিকমাহ' থেকে রাশি রাশি পুঁথি ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হল টাইগ্রিসের জলে, ভেজা পুঁথিতে আর কালিতে কথিত আছে নদীর জল কালো হয়ে গিয়েছিল। কয়েক বছর আগেই বর্বর তুর্কিদের দ্বারা নালন্দার ধংসে অবিভূত হয়ে আল-বেরুনি কিছু বাছা বাছা বই বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছিলেন 'বাইতুল আল হিকমাহ'-তে। কয়েকটির আরবী অনুবাদও হয়েছিল। তাঁর আশা ছিল, গ্রন্থপ্রেমী আরবরা এই বই রক্ষা করবে। সেই আশা টাইগ্রিসের কালো জলে তলিয়ে গেল।
বাগদাদের পতন যেটাকে আমরা 'ইসলামিক স্বর্ণযুগ' (মতান্তরে 'আরবিক স্বর্ণযুগ') বলি, তার অবসান ঘটাল। এই ধাক্কা, আরবরা আমার মতে এখনও সামলাতে পারেনি। উলেমারা লাফ দিয়ে উঠলেন। তাঁরা জোরালো গলায় প্রচার করতে লাগলেন - এ আল্লাহের শাস্তি। বিদআত এর বাড়াবাড়ির জন্যই খলিফাদের তিনি রক্ষা করেননি। মোঙ্গলদের দিয়ে শাস্তি দিয়েছেন। আর এই সবের মূলে ওইসব 'যুক্তিবাদী' কান্ডকারখানা। নাস্তিক কে সম্মান দিচ্ছেন খলিফা স্বয়ং ! এ অনাচার সয়না, সয়ও নি। এই কন্ঠগুলোর মধ্যে সবথেকে তীব্রতম ছিল - ইবন তাইমিয়া।
অন্ধ কবি আল-মা'আরি, তাঁর আমলের বিখ্যাত মুক্তচিন্তক, যুক্তিবাদী ও নাস্তিক
সময় - ১৭০৩ খ্রীস্টাব্দ। আরবের নজদ এলাকায় এক মরূদ্যানে জন্মগ্রহণ করলেন আবদুল ওয়াহাব। ছোটবেলা থেকেই ধর্মশাস্ত্রে তাঁর উৎসাহ ছিল। কুরআন চর্চায় তাঁর স্বাভাবিক ঝোঁক ছিল, কিন্তু তাঁর এলাকায় উচ্চ ইসলামিক শিক্ষার বিশেষ সুযোগ ছিল না। তাই মক্কায় হজ্ব শেষ করে তিনি যখন পাকাপকি ভাবে মদিনায় উচ্চ ইসলামিক ধর্মশিক্ষার জন্য রয়ে যান, তাঁর বাড়ির লোকজন কেউ বিশেষ অবাক হননি। ওয়াহাব চিরকালই মনে করতেন, তাঁর গ্রামে যথাযথ ইসলাম পালিত হচ্ছে না। মক্কাতে এসে তিনি দেখলেন, এখানেও ইসলামের পালন তাঁর চোখে বড্ড আলগা ধরণের। এই বড্ড বেশী উদার, বড্ড বেশী খোলামেলা ইসলামের পালন কি ভাবে আটকানো যায় তা নিয়ে অধ্যয়ন করতে লাগলেন তিনি। এই প্রেক্ষিতেই তাঁর হাতে লেগে গেল একটি বই। গোগ্রাসে পড়লেন ওয়াহাব ! আরে, এই তো তাঁর উত্তর, এই তো তাঁর পথ। এই আলেমের জন্যই তো তিনি পথ চেয়ে ছিলেন। লেখকের নাম - ইবন তাইমিয়া।
আবদুল ওয়াহাব
মক্কা ও মদিনায় থাকার অভিজ্ঞতায় তাইমিয়ার মোঙ্গল আক্রমণের আগের বাগদাদের ছায়া দেখলেন ওয়াহাব। তিনি বেশ বুঝলেন মানুষের এখনও শিক্ষা হয় নি। তারা এখনও বিদআত-এর ঝোঁক ছাড়েনি। এমনকি মক্কার শরিফ, আল-হাশিম বংশ, মহানবী মহম্মদের রক্ত যাঁদের ধমনীতে প্রবাহিত, তাঁদেরও ইসলামের এই উদার খোলামেলা, মানলেও হয়-না মানলেও হয় মানসিকতা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্চ নেই, ঠিক যেমন আব্বাসিদ খলিফাদের ছিল না। এই ভাবে চলে না। তিনি প্রচার করতে লাগলেন উম্মাহকে ফিরে যেতে হবে একেবারে হযরতের সময়ে - কোনো ওইসব বিচার বিশ্লেষণ চলবে না, কুরআনে হাদিসে লেখা আছে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে, এই ঢিলেমির একটা শেষ চাই। এরই মধ্যে এক অতি সম্ভ্রান্ত মহিলার উপর তিনি চরিত্রহীনতার অভিযোগ আনলেন, তাঁর অনুগামীরা হতভম্ব ভদ্রমহিলাকে পাথর ছুঁড়ে রাস্তার মাঝে হত্যা করল। এই ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন - যারা এমনিতেই তাঁর উপর ক্ষেপে ছিল, এইবার একেবারে গাছে ঝুলিয়ে দিতে সংকল্প নিল। বেগতিক দেখে হেজাজ ছেড়ে চলে গেলেন ওয়াহাব, আশ্রয় নিলেন নজদের কাছে এক মরূদ্যানে। খেজুর ঘেরা মরূদ্যানটির নাম - 'দারিয়া'।
সৌদ ইবন মুহাম্মদ ইবন মুকরিন গত হয়েছেন। দারিয়ার শাসক এখন তাঁর পুত্র - মুহাম্মদ বিন সৌদ। তিনি ওয়াহাব ও তাঁর শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হলেন। ১৭৪৪ খ্রীস্টাব্দে তাঁদের এই বন্ধুত্ত্ব বিবাহ সম্পর্কের রূপ নিল। মহম্মদ বিন সৌদের পুত্র আবদুল আজিজ বিবাহ করলেন আবদুল ওয়াহাবের কন্যাকে। ওয়াহাব এতদিন সামরিক ভাবে নিঃসহায় ছিলেন, ইবন সৌদের মধ্যে তিনি পেলেন এক যোগ্য শিষ্যকে যে তরবারির মাধ্যমে তাঁর অপমানের অবসান ঘটাবে, আর ইসলামকে আবার নিয়ে যাবে তার প্রথম যুগের বিশুদ্ধতায় -এইসব 'যুক্তিবাদী' -দের বিদআত-এর আগের সময়ে। মুহাম্মদ বিন সৌদ হবেন তাঁর আলি ইবন আবু তালিব। অভিযান শুরু হল। একের পর এক বেদুইন গোষ্ঠী সৌদ-ওয়াহাব মিলিত শক্তির সামনে মাথা নত করতে লাগল। প্রত্যেক যুদ্ধের আগে ওয়াহাব অশ্বপৃষ্ঠে শত্রু সৈন্যের সামনে দাঁড়াতেন আর জোর গলায় বলতেন - 'মূর্খের দল, কুফারের দল, এখনও সময় আছে। ইসলামের শরণ নাও। তিনবার শাহাদাহ্ বলো !'। বলাবাহুল্য, সৈন্যরা মাথা চুলকাত। এই সমস্ত বেদুইনরা, হযরতের সময় থেকে ইসলামের অনুসারী, আবার ইসলামের শরণ নেবে কি করে ? কিন্তু ওয়াহাবের মতে তারা এখন যে, তাঁর দৃষ্টিতে, ঢিলা ইসলাম, নামেমাত্র ইসলাম অনুসরণ করছে, তাতে তাঁদের মুসলিম বলা যায় না। যাই হোক, ১৭৬৬তে ইবন সৌদ আততায়ীর হাতে যখন নিহত হলেন, তখন সৌদির রাজ্য আড়ে বহরে বহুগুণ বেড়ে গেছে। ওয়াহাবের তরবারি এবার হাতে নিলেন তাঁর জামাতা ও মুহাম্মাদ ইবন সৌদের পুত্র - আবদুল আজিজ। ১৭৯২ তে ওয়াহাব প্রয়াত হলেন, কিন্তু তাঁর নামে স্কেমিটারের ঘূর্ণন থামল না। আজিজ ১৮০২ সালে কারবালা দখল করলেন, এবং পত্রপাঠ শহরবাসী ২০০০ শিয়ার মৃত্যুদণ্ড দিলেন। তাঁদের রক্তে কারবালার প্রান্তরে আরেকটি বিষাদ সিন্ধু রচিত হল। ১৮০৪-এ মদিনা তাঁদের হস্তগত হল, তারপরেই মক্কা। মক্কা দখলের পরেই তাঁর প্রথম পদক্ষেপ ছিল হজরতের সম্মানে নির্মিত স্মারকগুলি ধ্বংস করা, ওইটাতে যারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, তাঁরা নাকি শিরক করছেন। যতক্ষণ আজিজ নজদের মরুভুমিতে মধ্যে বেদুইন ঠেঙাচ্ছিলেন মহামহিম ইস্তাম্বুলের খলিফার কিছু যায় আসছিল না, কিন্তু মক্কা ও মদিনা দখল, হযরতের সম্মানার্থে নির্মিত স্মারক ধ্বংস করা ! আজিজ ভেবেছে কি ? খলিফা সেনাপতি মুহাম্মদ আলি পাশাকে পাঠালেন আজিজ ও সৌদি-ওয়াহাবি বাহিনীকে দমন করতে। আলি পাশা নেপোলিয়ঁর ফরাসী বাহিনীর সাথে পাল্লা দিয়ে লড়াই করেছেন, সৌদি-ওয়াহাবি বাহিনী তাঁর আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রে সুসজ্জিত সেনার কাছে ঝড়ের মুখে পাতার মতো উড়ে গেল। ১৮১৫ সালে আবদুল্লাহ ইবন সৌদ, আজিজের পুত্রকে ইস্তাম্বুলে খলিফার আদেশে শিরোচ্ছেদ করা হল। শিরোচ্ছেদের আগে, খলিফার আদেশে আরবের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সংগীতের চর্চা বন্ধ করে দেওয়ার ও মক্কা ও মদিনার ঐতিহাসিক সৌধগুলির অপূরণীয় ক্ষতি সাধনের শাস্তি হিসবে, তাঁর কানের কাছে বাঁশি বাজানোর ও উৎকৃষ্ট সংগীতের বন্দোবস্ত করা হয়। বলাই বাহুল্য, যে কোন ওয়াহাবি পন্থী গোঁড়া অনুগামীর পক্ষে এ ছিল মৃত্যুর থেকেও খারাপ। সৌদরা দমিত হল কিন্তু তারা তখনও মরেনি।বালিতে ডুবে থাকা ভাইপারের মতো তারা অপেক্ষা করতে লাগল নজদের মরুভূমিতে এই প্রতিজ্ঞা বুকে নিয়ে খলিফার অপমানের বদলা একদিন তারা নেবে।
আবদুল্লাহ ইবন সৌদ
এইবার আমাদের দৃষ্টি ফেরানো যাক এই কাহিনীর আরেক নায়কের দিকে। আগের ঘটনার প্রায় এক শতক পরের কথা। আমাদের নায়কের নাম হুসেইন ইবন আলি। ইনি হযরতের বংশধর এবং মক্কার শরিফ। হযরতের প্রপিতামহ হাশিম ইবন আবদ মানাফ-এর নাম অনুসারে তাঁর বংশ পরিচিত 'হাশমাইত' নামে। হুসেইনের পূর্বপুরুষরা খলিফার পতাকাতলে দাঁতে দাঁত চেপে সৌদি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। একসময় তারাই তাঁদের সব থেকে বড়ো শত্রু ছিল। কিন্তু এখন, এখন সৌদিরা তাঁদের কাছে কোনো বিপদই না, তারা আছে নজদের মরুভূমিতে তাঁদের বেদুইন জীবন নিয়ে, মক্কার শরিফের ওই দিয়ে কিছু যায় আসে না। বরং হুসেইনের দৃষ্টি ইউরোপের দিকে। আরেকটা মহাযুদ্ধ যে এগিয়ে আসছে, এটা তিনি বুঝতে পারছেন। অটোমান সাম্রাজ্য ও খলিফা জার্মানির সাথে জোট বেঁধেছে, কিন্তু হুসেইনের বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার। বরং তিনি এই ডামডোলের মধ্যে দেখছেন একটা সুযোগ। তাঁর লক্ষ্য, সিনাই থেকে হর্মুজ প্রণালী অবধি এক স্বাধীন ও আধুনিক আরব রাষ্ট্র। আরবী জাতীয়তাবাদ তাঁর রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মুসলিম, খ্রীশ্চান, ইয়েজদি, কোন আরবের কি ধর্ম তাঁর যায় আসে না। তাঁদের ভাষা, তাঁদের কৃষ্টি, তাঁদের সংস্কৃতি তুর্কিদের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এর থেকে মুক্তি চাই। তিনি প্রচার করতে থাকলেন ধর্ম পরে, খলিফার কাছে আনুগত্য পরে - প্রথম কথা ও আসল কথা তুমি আরব আর আরবদের অধিকার নিজেদের জন্য একটা আলাদা রাষ্ট্রের। কিন্তু এই স্বপ্নকে বাস্তব করতে চাই অর্থ ও অস্ত্র। শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু - এই অংক কষে তিনি গোপনে যোগাযোগ করলেন ব্রিটিশদের সাথে। কিছুদিনের মধ্যেই আরবের মাটিতে পা রাখলেন এক তরুণ ব্রিটিশ সামরিক ইন্টালিজেন্স অফিসার। তাঁর নাম টি.ই. লরেন্স। তিনি চোস্ত আরবী জানেন, নিজে বীরপুরুষ এবং সোজাসাপ্টা কথা বলতে ভালোবাসেন - অর্থাৎ যে তিনটি গুণ আরবের মানুষ সবথেকে পছন্দ করে, তিনটিই তাঁর আছে। কিছুদিনের মধ্যেই লরেন্স ও হুসেইনের সম্পর্ক বন্ধুত্ত্বে বদলে গেল। ওদিকে নজদের বালির ভাইপার আস্তে আস্তে মাথা তুলছে, তার দুই শত্রু - হেজাজের হাশমাইত ও ইস্তাম্বুলের খলিফা দুজনে যেন ভুলেই গেছে বালিতে ডুবে আছে বলে ভাইপার মিলিয়ে যায় না। কিছুদিন বাদে ব্রিটিশ বিদেশ দপ্তর আরেকটি চিঠি পেল অটোমান খলিফাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ইচ্ছুক এক শেখের। এনার নাম আবদুল আজিজ ইবন সৌদ।
বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবন সৌদ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। ব্রিটিশরা হাশমাইত আর সৌদ দুজনকেই সহায়তা করেছিল বটে, দুই শক্তিই কথা দিয়েছিল বিদ্রোহ করার, কিন্তু বাস্তবে কথা রেখেছে একমাত্র হুসেইন ইবন আলি। গেরিলা যুদ্ধে তুর্কি বাহিনীকে বারংবার পরাস্ত করে তিনি এখন আরব জাতীয়তাবাদের মুখ। তাঁর ছেলে ফয়জল, কিছুদিনের জন্য এমনকি দামাস্কাসকে অটোমান শাসন মুক্ত করতেও সক্ষম হয়েছিল। অন্যদিকে আবদুল আজিজ ইবন সৌদ এই বিরাট আরব বিদ্রোহকে সমর্থন করতে একটা আঙুলও নড়ানোর দরকার বোধ করেননি। চুপ চাপ অস্ত্র ও অর্থ জমিয়েছেন। এদিকে কামাল পাশা যখন তুরস্কের খলিফাতন্ত্রের অবসান ঘটালেন, তখন হুসেইন খলিফা উপাধি নিলেন। তাঁর শত্রুরাও জানতেন, এই উপাধি তাঁরই প্রাপ্য। এইবার তিনি ব্রিটিশদের কাছ থেকে তাঁর অধিকার চাইলেন। তাঁকে আরব-সিরিয়া-জর্ডন-প্যালেস্তাইন নিয়ে এক স্বাধীন আরব রাষ্ট্রের অধিপতি হিসেবে তাঁরা স্বীকার করুক - যে রকম কথা ছিল। ব্রিটিশদের কথার যে কোনো দাম নেই, এ আমাদের এশিয়াবাসীদের এতদিনে বোঝা উচিৎ ছিল। দুঃখের বিষয়, খুব সহজ শিক্ষাও আমরা দশবার ঠেকে শিখি। অবাক হয়ে হুসেইন দেখলেন, ভার্সাই সন্ধিতে তাঁকে না জানিয়েই যে এলাকা মিত্রপক্ষ কথা দিয়েছিল স্বাধীন আরব রাষ্ট্রে যাবে, সেটা ফ্রান্স ও ব্রিটেন ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। তিনি নিজে ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন সৎ ও এক কথার মানুষ। তাঁর সাথে এতজন রাজপুরষ নৈতিকতা চুলোয় রেখে কথার খেলাপ করবেন, এ তাঁর কাছে অভাবনীয় ছিল। তিনি ভার্সাই সন্ধি স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃত হলেন, আর বললেন এইভাবে চললে আবার আরেকবার বিদ্রোহের ঝান্ডা তুলতে তিনি পিছপা হবেন না। ইতিমধ্যে ভাইপার নজদের মরুভূমি থেকে মাথা তুলেছে। হুসেইনের বাহিনী দীর্ঘকাল অটোমানদের সঙ্গে লড়াই করে ক্লান্ত, তাঁদের সামরিক বল তলানীতে। এদিকে সৌদি বাহিনী এতকাল লড়াই করেইনি, তাঁদের বাহিনী সুসজ্জিত ও একেবারে পূর্ণ ক্ষমতায়। হুসেইন জর্ডনে থাকতেই খবর পেলেন সৌদি সেনা নজদের মরুভূমি থেকে হেজাজের দিকে ধেয়ে আসছে, ঠিক যেমন একদা আবদুল ওয়াহাবের সময় এসেছিল। আবার কারবালার পতন হল, আবার মদিনা হাতছাড়া হল। হুসেইন আর ফয়জল মরনপণ লড়েও মক্কা রাখতে পারলেন না। হেজাজের হাশমাইত বংশ, হযরতের বংশধর, প্রায় হাজার বছরের মক্কার শরিফ, মক্কা ত্যাগ করে চলে যেতে বাধ্য হলেন। ব্রিটিশরা কিন্তু হুসেইনকে সাহায্য করতে কোনো চেষ্টাই করেননি, বরং তারা আবদুল আজিজ ইবন সৌদকে গোপনে গোপনে মদত দিয়েছে। কারণ তারা জানে হুসেইনের মতো আবদুল আজিজের কোনো আরব জাতীয়তাবাদের ভূত মাথায় নেই, তাঁদের মাথার ভূতটা ধর্মের ভূত আর ওই ভূতটাকে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধিতে কিভাবে লাগানো যায় মহারানীর সেবকরা জানে। তারা ১৯২৭ সালে ইবন সৌদের সাথে জেদ্দার চুক্তির মাধ্যমে তাকে আরবের স্বাধীন শাসক বলে মেনে নেয়। তবে আরবের নেতারা আরব বিদ্রোহের সময় ইবন সৌদের ভূমিকা ভোলেনি। হুসেইনকে তাঁদের শাসক হিসেবে মানতে তাঁদের কোনো আপত্তি ছিল না, কিন্তু বিনা যুদ্ধে সৌদকে রাজা মানতে তারা রাজি হল না। ১৯৩২ সালের মধ্যে ব্রিটিশ সহায়তায় এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে দমন করে ইবন সৌদ আরবের একছত্র শাসক হয়ে বসলেন। রাষ্ট্রধর্ম হল ওয়াহাবি ইসলাম। ঠিক তার একবছর আগে, হযরত মুহাম্মদের ৩৭ তম প্রত্যক্ষ বংশধর, মক্কার শরিফ ও আরব জাতির রাজা, আরব বিদ্রোহের নায়ক, আরব জাতীয়তাবাদের সূর্য হুসেইন ইবন আলি ব্রিটিশ অধিকৃত সাইপ্রাসে ভগ্ন হৃদয়ে, নির্বান্ধব ও একাকী জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তবে হয়তো যেদিন তিনি খবর পেয়েছিলেন সৌদ মক্কা দখলের পর বিখ্যাত জান্নাতুল বাকি - যেখানে মুহাম্মদের বহু অনুগামী ও আত্মীয় শায়িত আছেন, তার মাজার ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন, সেদিনই সম্ভবতঃ তাঁর মানসিক মৃত্যু হয়েছিল।
হুসেইন ইবন আলি, আরব জাতির রাজা
আমাদের গল্প এখানেই শেষ। হাশমাইত রাজবংশ এখনও আছে। যুবরাজ ফয়জল পরে জর্ডনের রাজা হয়েছিলেন। এখনও জর্ডনে হযরত মুহম্মাদের বংশধররা ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত। মহারাজ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ বিন আল হুসেইন এখন জর্ডনের রাজা এবং তাঁর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম সৌদি আরবের যুবরাজ মুহম্মাদ বিন সালমান। ইতিহাস আবর্তিত হয় না, তবে তার মধ্যে একটা ছন্দ থাকে। ঐতিহাসিকের নিরপেক্ষ হওয়া উচিৎ, কিন্তু এই একটা সংঘাতে আমি একেবারেই নিরপেক্ষ নই। কোনো ভাবে কোনোদিন, আরবের শাসনভার আবার যদি হাশমাইত বংশের হাতে পড়ে, হযরত মুহাম্মদের বংশধররা আবার যদি মক্কার শরিফ হন, আমি অন্তত অখুশি হব না।
মহারাজ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ বিন আল হুসেইন ও মহারানী রানিয়া আল আবদুল্লাহ
সূত্র -
- তামিম আনসারি - 'ডেস্টিনি ডিসরাপ্টেড - ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি থ্রু ইসলামিক আইজ'
- ফিলিপ কে হিট্টি - 'আরব জাতির ইতিহাস'
No comments:
Post a Comment