হজরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর ইন্তেকাল এর পরে সাহাবা আজমাইন (রাঃ) গণ, ২ টি সাম্রাজ্য জয়ের জন্য অনেক অভিযান পরিচালনা করেন। তারা ছিল তৎকালীন দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য। একটি হল বাইজেন্টাইন বা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য আর একটি হল পারস্য সাম্রাজ্য।আমার নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এই দুই সাম্রাজ্যের জন্য ভবিষ্যতবানী দিয়ে যান যে এগুলো মুসলমানদের আয়ত্তে আসবে। এই দুই সাম্রাজ্য জয়ের পরে মুসলিম শাসকরা তাদের দৃষ্টি দেন ইউরোপ আফ্রিকা ও রাশিয়ার প্রতি এই কারণে এইসব দেশে অনেক মুসলিম রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়।
আমি নিচে সরাসরি চীনের সম্রাটের সাথে পারস্য সম্রাটের দুতের কথোপকথন উল্লেখ করলাম,চীনের সম্রাট মুসলমানদের ব্যাপারে খুব ভীত হয়ে গিয়েছিল ...এই কথোপকথন থেকে আমাদের শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে কেন আজ আমরা অপদস্থ, কেন নির্যাতিত? বার বার পড়ুন -
সাহাবা (রাঃ) দের সম্পর্কে চীনের বাদশাহের উক্তি ইবনে জারীর (রহঃ) তাহার ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন যে, ইয়াজদাজির (ইরানের বাদশাহ) চীনের বাদশাহের নিকট মুসলমানদের বিরুদ্ধে ) সাহায্যের জন্য চিঠি লিখিল । চীনের বাদশাহ তখন পত্রবাহককে বলিল , আমার জানা আছে যে , যখন কোন বাদশাহের উপর তাহার শত্রু শক্তি জয়লাভ করে আর সে অপর কোন বাদশাহের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে তখন তাহাকে সাহায্য করা সেই অপর বাদশাহের উপর অবশ্য কর্তব্য হইয়া যায় । কিন্তু তুমি প্রথম আমাকে তাহাদের গুণাবলী ও তাহাদের অবস্থা সম্পর্কে বল , যাহারা তােমাদেরকে তােমাদের দেশ হইতে বিতাড়িত করিয়াছে । কারণ আমি দেখিতেছি , তুমি তাহাদের সংখ্যা কম ও তােমাদের সংখ্যা অধিক বলিতেছ । আমি ইহাও শুনিয়াছি যে , তােমাদের সংখ্যা অধিক হওয়া সত্ত্বেও এই কমসংখ্যক লােক তােমাদের উপর জয়লাভ করিতেছে আর ইহার একমাত্র কারণ এই যে , তাহাদের মধ্যে কিছু ভাল গুণ রহিয়াছে আর তােমাদের মধ্যে কিছু মন্দ জিনিস রহিয়াছে । পত্রবাহক বলেন , আমি বলিলাম , আপনি তাহাদের সম্পর্কে যাহা ইচ্ছা হয় আমাকে জিজ্ঞাসা করিতে পারেন । চীনের বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিল , তাহারা কি ওয়াদা অঙ্গীকারকে পালন করে ? আমি বলিলাম , জ্বি , হাঁ । সে জিজ্ঞাসা করিল , তাহারা যুদ্ধ আরম্ভ করার পূর্বে তােমাদেরকে কি বলে ? আমি বলিলাম , তাহারা আমাদের তিন বিষয়ের একটি গ্রহণ করার প্রতি আহ্বান জানায় । প্রথম তাহারা আমাদেরকে তাহাদের দ্বীনের প্রতি দাওয়াত প্রদান করে , যদি আমরা তাহা গ্রহণ করি তবে তাহারা আমাদের সহিত সেই আচরণ করে যাহা তাহারা নিজেদের পরস্পরের সহিত করিয়া থাকে । তারপর তাহারা আমাদের কর প্রদানের আহব্বান জানায় এবং আমাদের নিরাপত্তা ও হেফাজত করিবে বলে জানায়। যদি আমরা এই দুই বিষয়ের একটিও গ্রহণ না করি তাহারা আমাদের সহিত যুদ্ধ করিবে বলিয়া জানায় । অতপর বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিল , তাহারা তাহাদের আমীরকে কিরুপ মান্য করে? আমি বলিলাম , তাহারা তাহাদের আমীরের সর্বাধিক আনুগত্য করে। বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিল , তাহারা কোন জিনিসকে হালাল কোন জিনিসকে হারাম মনে করে? আমি তাহাকে মুসলমানদের হালাল ও হারাম সম্পর্কে বিস্তারিত বলিলাম ।
বাদশাহ জিজ্ঞাসা করিল , তাহারা কি হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল বানাইয়া ফেলে ? আমি বলিলাম , না । বাদশাহ বলিল , যতদিন তাহারা হারামকে হালাল না বানাইয়া ফেলবে ? হালালকে হারাম না বানাইবে ততদিন তারা ধ্বংস হইবে না । আমাকে তাহাদের পােশাক সম্পর্কে বল । আমি তাদের পােশাক সম্পর্কে বিস্তারিত বলিলাম । তারপর বলিল , তাহাদের সওয়ারী সম্পর্কে বল । আমি বলিলাম , তাহাদের সওয়ারী হইল , আরবী ঘাড়া । অতঃপর আমি আরবী ঘােড়ার গুনাগুণ বর্ণনা করিলাম । বাদশাহ বলিল , ইহা অতি উত্তম দুর্গ । আমি বলিলাম , তাহাদের সওয়ারীর মধ্যে উটও রহিয়াছে । উটের বসা ও বােঝা লইয়া দাঁড়ানাের ভঙ্গি সমস্তই বর্ণনা করিলাম । সে বলিল , এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য লম্বা ঘাড় বিশিষ্ট জানােয়ারের মধ্যে হইয়া থাকে ।
অতঃপর চীনের বাদশাহ ইয়াজদাজিরদের নিকট উত্তর লিখিল যে , "আমার নিকট এত বিশাল বাহিনী রহিয়াছে যে , যদি আমি উহা আপনার সাহায্যের জন্য পাঠাই তবে উহার প্রথমাংশ ইরানের মারও শহরে হইবে আর উহার শেষাংশ চীনে হইবে । কিন্তু আমি এই সেনাবাহিনী পাঠাইব না। আর না পাঠাইবার কারণ এই নয় যে , আমার উপর আপনার যে হক রহিয়াছে তাহা আমি জানি না , বরং ইহার কারণ এই যে , যেই ধরনের লোকদের সহিত আপনার যুদ্ধ চলিতেছে তাহাদের অবস্থা সম্পর্কে আপনার পত্রবাহক আমাকে বিস্তারিত জানাইয়াছে । তাহারা এমন শক্তিশালী জাতি যদি তাহারা পাহাড়কে ধাক্কা দেয় তবে পাহাড়ও চূর্ণ বিচূর্ণ - হইয়া যাইবে । যদি তাহারা নিজেদের এই সমস্ত গুণাবলীর উপর বিদ্যমান থাকে, আর এইভাবে অগ্রসর হইতে থাকে তবে একদিন তাহারা আমাকেও রাজ্যচ্যুত করিয়া ছাড়িবে । অতএব আপনি সন্ধি করিয়া তাহাদের সহিত একত্রে বসবাসের উপর সন্তুষ্ট থাকুন এবং যতক্ষণ তাহারা আপনাকে না খোঁচায় ততক্ষণ আপনিও তাহাদেরকে খোঁচাইবেন না। "
পারস্য যুদ্ধের কিছু বর্ণনা :
পারস্য অভিযানে হজরত ওমর (রাঃ) স্বয়ং অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু যেহেতু খেলাফতের দায়িত্ব তার উপর ছিল এইজন্য যেতে পারেননি। পরবর্তিতে হযরত সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস ( রাযিঃ ) -কে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়, হযরত সা ' দ ( রাযিঃ ) অত্যন্ত বীরপুরুষ ও আরবের সিংহ বলিয়া পরিচিত ছিলেন । সিদ্ধান্ত মােতাবেক হযরত সা ' দ ( রাযিঃ ) কে পাঠানাে হইল । তিনি যখন কাদেসিয়া নামক স্থানে হামলা করার উদ্দেশ্যে পৌছেন তখন ইরানের সম্রাট বিখ্যাত পালােয়ান রােস্তমকে তাঁহার মােকাবেলায় পাঠানাের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে । রােস্তম আপ্রাণ চেষ্টা করিল যুদ্ধে না যাওয়ার জন্য । সম্রাটের কাছে আবেদন করিল , আমি আপনার কাছে থাকিলেই ভাল হইবে । আসলে সে বড় ভীত হইয়া পড়িয়াছিল। কিন্তু বাহিরে প্রকাশ করিতেছিল যে , এখান হইতে আমি সেনাবাহিনী প্রেরণ করিব এবং প্রয়ােজনীয় শলাপরামর্শে আপনাকে সহযােগিতা করিব । কিন্তু সম্রাট ইয়াযদাজারুদ তাহার আবেদন গ্রহন করিল না এবং বাধ্য হই তাহাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করিতে হইল ।
পারস্য যুদ্ধের অংকিত ছবি
হযরত সাদ ( রাযিঃ ) অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে বাহিনী রওয়ানা হইলেন যাহা রােস্তমের প্রতি তাহার প্রেরিত চিঠি দ্বারা অনুমান করা যায় । তিনি তাকে লিখেন
“ নিশ্চয়ই আমার সহিত এমন এক বাহিনী রহিয়াছে যাহারা মৃত্যুকে এইরূপ ভালবাসে যেমন তােমরা শরাব পান করাকে ভালবাস । ” ( তাফসীরে আযীবীঃ ১ম খণ্ড )
শরাবের আসক্ত লােকদেরকে জিজ্ঞাসা করুন, শরাবে কি স্বাদ রহিয়াছে ? আর যাহারা মৃত্যুকে ঐরূপ ভালবাসে , সফলতা তাহাদের পদ চুম্বন করিবে না কেন ?
রুস্তম ২ লক্ষ লোকের সেনাবাহিনী নিয়ে আসে আর হজরত সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস ( রাযিঃ ) ১০,০০০ মুজাহিদ নিয়ে আসেন। যুদ্ধে পারস্য বাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আর তৎকালীন চীনা সেনাবাহিনী পারস্যের চেয়ে অনেক দুর্বল ছিল,পারস্যবাসীর যুদ্ধকৌশল অনেক উন্নত ছিল। তারা ছিল সেই সময়ের পরাশক্তি।
পারস্যের যুদ্ধে তাদের সামনে খরস্রতা দজলা নদী পরে, মুসলমানদের বাহিনী সে নদী এমন ভাবে পার হয়ে যান যেন শুকনো ময়দান।হজরত সা‘দ বিন আবী ওয়াক্কাস (রাঃ) নদীতে নামার পূর্বে সৈন্যদেরকে নিম্নের দো‘আটি পাঠ করার নির্দেশ দিলেন,
نَسْتَعِيْنُ باللَّه وَنَتَوَكَّلُ عَلَيْهِ، حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا باللَّه الْعَلِيِّ الْعَظِيْمِ
অর্থাৎ ‘আমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি এবং তাঁর উপরই ভরসা করি। আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট। তিনিই উত্তম অভিভাবক। নেই কোন শক্তি, নেই কোন ক্ষমতা, আল্লাহ ব্যতীত। যিনি সুমহান’।
সা‘দ বিন আবী ওয়াক্কাস (রাঃ) প্রথমে তাঁর ঘোড়া নিয়ে পানিতে ঝাঁপ দিলেন। অন্যরাও তাঁর অনুসরণ করে নদীতে নেমে পড়ল। তারা পানির উপর এমনভাবে পথ চলতে লাগল যেন তারা সমতল ভূমিতে পথ চলছিল। শুকনো জমিনে চললে ঘোড়ার খুড়ের যে শব্দ হয়ে থাকে, সে রকম শব্দ হচ্ছিল। এভাবে নদীর দু’কিনারা ভরে গেল। অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর সৈন্যদের ভিড়ে নদীর পানি দেখা যাচ্ছিল না। স্থলভাগে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার ন্যায় তারা পানিতে পরস্পরে আলাপ-আলোচনা করছিল। এটা এইজন্য সম্ভব হয়েছিল যে, আল্লাহ তাদের সাথে ছিলেন ।
এই ঘটনা চীনা সম্রাটের অজানা ছিল না, এইজন্য তিনি উপরের মন্তব্য করেছিলেন।
চীনের সম্রাটরা চায়নি মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে, এইজন্য তারা সেইসময়েই মুসলমানদের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করার জন্য চেষ্টা করে এবং তারা সফল হয়।
এক সময়ে সময় চীনা সম্রাট সোয়ানসোংকে জনৈক ষড়যন্ত্রকারী সিংহাসনচ্যুত করেন, তখন তার পুত্র তৎকালীন আব্বাসিয় খলিফা মানসুরের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। খলিফা তার সাহায্যে ৪ হাজার সৈন্য প্রেরণ করেন এবং তাদের সাহায্যে সম্রাট সোয়ানসোং আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। এই ঘটনায় উহাও প্রমাণিত হয় যে তাবেঈনরা চীনে যুদ্ধও করেছেন।
No comments:
Post a Comment